ওযু, গোসল ও তায়াম্মুম সম্পর্কিত

ওযুর ফরযঃ ৪টি। (১) কুলি করা, নাকে পানি দিয়ে ঝাড়া ও পুরো মুখমন্ডল ভাল্ভাবে ধৌত করা (২) কনুইসহ দুই হাত ধৌত করা (৩) (ভিজা হাতে) কান্সহ মাথা মাসেহ করা (৪) টাখনুসহ দুই পা ধৌত করা।
    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ۚ وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ۚ وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ ۚ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَٰكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু ইজা কুমতুম ইলাস-সালাতি ফাগসিলু উজুহাকুম ওয়াইদিয়াকুম ইলাল-মারাফিকি ওয়ামসাহু বিরু’উসিকুম ওয়া আরজুলাকুম ইলাল-কা আবাইন। ওয়াইন কুনতুম জুনুবান ফাত্তাহহারু। ওয়াইন কুনতুম মারদা আও ‘আলা সাফারিন আও জা-আ আহাদুম মিনকুম মিনাল-গাআইতি আও লামাসতুমুন নিসা-আ ফালাম তাজিদু মা-আন ফাতায়াম্মামু সা’ঈদান ত্বাইয়িবান ফামসাহু বিউজুহিকুম ওয়াইদিয়িকুম মিনহু। মা ইউরিদুল্লাহু লিয়াজআলা ‘আলাইকুম মিন হারাজিন ওয়ালা-কিন ইউরিদু লিয়ুত্বাহহিরাকুম ওয়ালিইউতিম্মা নিআমাতাহু ‘আলাইকুম লা’আল্লাকুম তাশকুরুন।
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, মাথা মাসেহ করো এবং পা গিরা পর্যন্ত ধুয়ে নাও। আর যদি তোমরা অপবিত্র অবস্থায় থাকো তবে গোসল করো। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা নারীদের স্পর্শ করো এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাটি দ্বারা মাসেহ করো। আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো কষ্ট চাপাতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদেরকে পবিত্র করতে এবং তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।                                      [সূরা (নং-৫) মায়েদাহঃ আয়াত-৬]
এই আয়াতে বর্ণিত ৪টি ফরজ বাদে ওযুর বাকী সবই সুন্নত।

ওযুর তরীকাঃ
(১) প্রথমে মনে মনে ওযুর নিয়ত করবে। (২) 'বিসমিল্লাহ' বলবে। (৩) ডান হাতে পানি নিয়ে দুই হাত কব্জি সমেত ধুবে এবং আঙ্গুল সমূহ খিলাল করবে। (8) ডান হাতে পানি নিয়ে ভালভাবে কুলি করবে ও প্রয়োজনে নতুন পানি নিয়ে নাকে দিয়ে বাম হাতে ভালভাবে নাক ঝাড়বে। (৫) কপালের গোড়া থেকে দুই কানের লতী হয়ে থুতনীর নীচ পর্যন্ত পুরা মুখমন্ডল ধৌত করবে ও দাড়ি খিলাল করবে। এজন্য এক অঞ্জলি পানি নিয়ে থুতনীর নীচে দিবে। (৬) প্রথমে ডান ও পরে বাম হাত কনুই সমেত ধুবে। (৭) পানি নিয়ে ২ দু'হাতের ভিজা আংগুলগুলি মাথার সম্মুখ হ'তে পিছনে ও পিছন হ'তে সম্মুখে বুলিয়ে একবার পুরা মাথা মাসাহ করবে। একই সাথে ভিজা শাহাদাত আংগুল দ্বারা কানের ভিতর অংশে ও বুড়ো আংগুল দ্বারা পিছন অংশে মাসাহ করবে। পাগড়ীবিহীন অবস্থায় মাথার কিছু অংশ বা এক চতুর্থাংশ মাথা মাসাহ করার কোন দলীল নেই। বরং কেবল পূর্ণ মাথা অথবা মাথার সামনের কিছু অংশ সহ পাগড়ীর উপর মাসাহ অথবা কেবল পাগড়ীর উপর মাসাহ প্রমাণিত। (৮) ডান ও বাম পায়ের টাখনু সমেত ভালভাবে ধুবে ও বাম হাতের আংগুল দ্বারা পায়ের আংগুলসমূহ খিলাল করবে। (৯) এভাবে ওযু শেষ করার পর বাম হাতে কিছু পানি নিয়ে লজ্জাস্থান বরাবর ছিটিয়ে দিবে ও নিম্নোক্ত দুয়া পাঠ করবে - 
    ওযুর পর ২ টি দুআ পড়বেনঃ 
১। কালেমা শাহাদতঃ 
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহূ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়া রাসূলুহূ।
ফজিলতঃ
    পাঠকারীর জন্য জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে।    
(মুসলিম ১-২০৯, মুসলিম ২২৪, নাসাঈ ১৪৮)
 
২। পবিত্রতা এবং ঈমান নবায়নের দুআঃ
اَللّهُمَّ اجْعَلْنِيْ مِنَ التَّوَّابِيْنَ، وَاجْعَلْنِيْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ
আল্লাহুম্মাজ আলনী মিনাত তাওয়াবীন, ওয়াজ্‌-আলনী মিনাল মুতা-তাহ-হিরীন
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাকে পরিচ্ছনতাপ্রিয় করে দিন।
(তিরমিজি ৫৫, মিশকাত ২৮৯)
৩। 
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ
সুবহানাকাল্লা-হুম্মা ওয়া-বিহামদিকা, আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লা আন্তা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইক।
অর্থাৎঃ তোমার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করছি হে আল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমিই একমাত্র সত্য উপাস্য। আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন (তওবা) করছি। 
(ত্বাহাবী, সহিহ তারগিব ২১৮নং, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ১/১৩৫, ৩/৯৪)
বিশেষ সতর্কতাঃ
    এ ছাড়া প্রত্যেক অঙ্গ ধোয়ার সময় নির্দিষ্ট দুআ অথবা শেষে ‘ইন্না আনযালনা’ পাঠ বিদআত।

আমলে সলেহীনঃ প্রত্যেক ওযুর পর ২ রাকাত নফল সালাত আদায় করা।
    উত্তমরূপে অযু করে একাগ্রচিত্তে ২ রাকাত সালাত আদায়কারীর পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।                                               (বুখারী ১৫৯, মুসলিম ৫৩৯)
    তাঁর জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।   (নাসাঈ ১৫১)

ওযুর আনুষঙ্গিক মাসায়েল
ওযুর অঙ্গগুলোকে কমপক্ষে ১ বার করে ধোয়া জরুরী। ২ বার করে ধুলেও চলে। তবে ৩ বার করে ধোয়াই উত্তম। এরই উপরে আল্লাহর রসূল (সাঃ) তথা সাহাবায়ে কেরামের আমল বেশী। কিন্তু তিনবারের অধিক ধোয়া অতিরঞ্জন, বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করা। 
(আবূ দাউদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ৪১৭-৪১৮ নং)

ওযুর আনুষঙ্গিক মাসায়েল সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - https://bit.ly/ojurmasayel
রোগীর পবিত্রতা ও ওযু-গোসল সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - https://bit.ly/rogiroju
ওযু নষ্ট হওয়ার কারণসমূহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - https://bit.ly/ojunoshto
যাতে ওযু নষ্ট হয় না সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - https://tinyurl.com/ojunoshto2
যে যে কাজের জন্য ওযু জরুরী বা মুস্তাহাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন – 
https://tinyurl.com/ojumustahab
মোজার উপর মাসাহ্‌ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন – 
https://tinyurl.com/moja-soho-oju
তায়াম্মুম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন – https://tinyurl.com/tayammum-oju
নামাযীর লেবাস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন –  
https://tinyurl.com/namazir-lebash

গোসলের বিবরণ 
সংজ্ঞাঃ 'গোসল' অর্থ ধৌত করা। শারঈ পরিভাষায় গোসল অর্থ, পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে ওযু করে সর্বাঙ্গ ধৌত করা। গোসল দু'প্রকারঃ ফরয ও মুস্তাহাব। 
(১) ফরয গোসলঃ ঐ গোসলকে বলা হয়, যা করা অপরিহার্য। বালেগ বয়সে নাপাক হ'লে গোসল ফরয হয়। যেমন - আল্লাহ বলেন, "যদি তোমরা নাপাক হয়ে থাক, তবে গোসল কর।" [সূরা (নং৫) মায়েদাহ ৬]
(২) মুস্তাহাব গোসলঃ ঐ গোসলকে বলা হয়, যা অপরিহার্য নয়। কিন্তু করলে নেকী আছে। যেমন- জুম’আর দিনে বা দুই ঈদের দিনে গোসল করা। সাধারণ গোসলের পূর্বে ওযু করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

গোসলের পদ্ধতিঃ ফরয গোসলের জন্য প্রথমে দু'হাতের কব্জি পর্যন্ত ধুবে ও পরে নাপাকী ছাফ করবে। অতঃপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ছালাতের ওযুর ন্যায় ওযু করবে। অতঃপর প্রথমে মাথায় তিনবার পানি ঢেলে চুলের গোড়ায় খিলাল করে ভালভাবে পানি পৌছাবে। তারপর সারা দেহে পানি ঢালবে ও গোসল সম্পন্ন করবে।

জ্ঞাতব্যঃ (১) গোসলের সময় মেয়েদের মাথার খোপা খোলার দরকার নেই। কেবল চুলের গোড়ায় তিনবার তিন চুল্লু পানি পৌছাতে হবে। অতঃপর সারা দেহে পানি ঢালবে।
(২) রাসূল (সাঃ) এক মুদ্দ (৬২৫ গ্রাম) পানি দিয়ে ওযু এবং অনধিক পাচ মুদ্দ (৩১২৫ গ্রাম) বা প্রায় সোয়া তিন কেজি পানি দিয়ে গোসল করতেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অপচয় করা ঠিক নয়। 
(৩) নারী হৌক পুরুষ হোক সকলকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) পর্দার মধ্যে গোসল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
(৪) বাথরুমে বা পর্দার মধ্যে বা দূরে লোকচক্ষুর অন্তরালে নগ্নাবস্থায় গোসল করায় কোন দোষ নেই।
(৫) ওযু সহ গোসল করার পর ওযু ভঙ্গ না হলে পুনরায় ওযূর প্রয়োজন নেই।
(৬) ফরয গোসলের পূর্বে নাপাক অবস্থায় পবিত্র কুরআন স্পর্শ করা যাবে না। তবে মুখে কুরআন পাঠ করা এবং মসজিদে প্রবেশ করা জায়েয আছে। সাধারণ অপবিত্রতায় কুরআন স্পর্শ করা বা বহন করা জায়েয আছে।
 
মুস্তাহাব গোসল সমূহঃ
(১) জুম'আর ছালাতের পূর্বে গোসল করা।
(২) মোর্দা গোসল দানকারীর জন্য গোসল করা।
(৩) ইসলাম গ্রহণের সময় গোসল করা।
(8) হজ্জ বা ওমরাহ্‌র জন্য ইহরাম বাধার পূর্বে গোসল করা।
(৫) আরাফার দিন গোসল করা।
(৬) দুই ঈদের দিন সকালে গোসল করা।

 
(গ) তায়াম্মুমের বিবরণ 
সংজ্ঞাঃ তায়াম্মুম অর্থ ‘সংকল্প করা’। পারিভাষিক অর্থে: “পানি না পাওয়া গেলে ওযু বা গোসলের পরিবর্তে পাক মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের ইসলামী পদ্ধতিকে ‘তায়াম্মুম’ বলে। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ্‌র অন্যতম বিশেষ অনুগ্রহ। যা ইতিপূর্বে কোন উম্মতকে দেওয়া হয়নি। আল্লাহ বলেন, “আর যদি তোমরা পীড়িত হও কিংবা সফরে থাকো অথবা পায়খানা থেকে আসো কিংবা স্ত্রী স্পর্শ করে থাকো, অতঃপর পানি না পাও, তাহলে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা ‘তায়াম্মুম’ করো ও তা দ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদয় মাসাহ করো।”
[সূরা নিসাঃ ৪/৪৩, সূরা মায়েদাহ ৫/৬]

তায়াম্মুমের পদ্ধতিঃ পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মাটির উপর দু'হাত মেরে তাতে ফুঁক দিয়ে মুখমণ্ডল ও দু’হাতের কব্জি পর্যন্ত একবার বুলাবে। দুইবার হাত মারা ও কনুই পর্যন্ত মাসাহ করার হাদীছ যঈফ।

তায়াম্মুমের কারণ সমূহঃ (১) যদি পাক পানি না পাওয়া যায় (২) পানি পেতে গেলে যদি ছালাত কাযা হওয়ার ভয় থাকে (৩) পানি ব্যবহারে যদি রোগ বৃদ্ধির আশংকা থাকে (8) যদি কোন বিপদ বা জীবনের ঝুঁকি থাকে ইত্যাদি। উপরোক্ত কারণ সমূহের প্রেক্ষিতে ওযু বা গোসলের পরিবর্তে প্রয়োজনে দীর্ঘদিন যাবত একটানা ‘তায়াম্মুম’ করা যাবে। 



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন