প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ইসলামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আমল রয়েছে, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে করতেন এবং সাহাবীদের শিখিয়েছেন। এগুলো পালন করলে ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়, শয়তানের ক্ষতি থেকে হেফাজত হয় এবং অসংখ্য সওয়াব পাওয়া যায়।
আমাদের প্রিয় নবী [সাঃ] কখনো এই আমলগুলো ছাড়া ঘুমাতেন না। এই আমলগুলো করতে মাত্র ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে, কিন্তু এর বিনিময়ে আপনি পেতে পারেন সারারাত ইবাদতের সওয়াব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী।
নিচে সহীহ হাদিসের আলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণভাবে উল্লেখিত ১২টি আমল বিস্তারিত দিলাম:
🌳১. অজু করে ঘুমানো ও বিছানা ঝেড়ে নেওয়া:
রাসূল [সাঃ] বলেছেন, "যে ব্যক্তি অজু অবস্থায় ঘুমায়, তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা রাত কাটায় এবং লোকটির জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত দোয়া করে।"
এতে ঘুমের অবস্থায়ও পবিত্র থাকা যায়। [আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৪২]
বিছানায় শোয়ার আগে ৩ বার কাপড় দিয়ে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া সুন্নাহ। কারণ সেখানে কোনো ক্ষতিকর পোকা বা ধূলিকণা থাকতে পারে।
🌳২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত [২৮৫-২৮৬]:
রাসূল [সাঃ] বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে এ দুই আয়াত পড়ে ঘুমায়, তার জন্য সেটা যথেষ্ট (সারা রাতের হেফাজতের জন্য)। [সহীহ বুখারি, হাদিস: ৪০০৮]
[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম]
২.২৮৫। আ-মানার রাসূলু বিমা-- উনঝিলা ইলাইহি মির রব্বিহী-ওয়াল মুমিনূন; কুল্লুন আ-মানা বিল্লা-হী ওয়া মালা--ইকাতিহী- ওয়া কুতুবিহী- ওয়া রুসুলিহী-; লা নুফাররিকু বায়না আহাদিম মির রুসুলিহী-; ওয়া কলূ সামি’না ওয়া আতা’না গুফরানাকা রব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাছীর।
২.২৮৬। লা-ইউকাল্লি ফুল্লা-হু নাফসান ইল্লা-উছ আহা। লাহা মা কাসাবাত ওয়া আলাইহা মাকতাসাবাত। রব্বানা লা তু’আখিযনা ইন্নাসীনা--আও আখতানা। রব্বানা ওয়ালা তাহমিল আলাইনা-- ইছরান কামা হামালতাহূ আলাল্লাযীনা মিন কবলিনা। রব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মালাতা কতালানা বিহী- ওয়া’ফু আন্না- ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা আনতা মাওলা-না ফানসুরনা আলাল কওমিল কা-ফিরীন।
ফযিলতঃ
সূরা ফাতেহার পর সুরা বাকারার শেষ ২ আয়াত পাঠ করে দু’আ করলে আল্লাহ তা’লা সে দু’আ কবুল করেন।
ক্লান্তির কারনে কেউ রাতে ঘুমানোর আগে সুরা বাকারার শেষ ২ আয়াত পাঠ করলে এতটুকুই তাঁর জন্য [অন্য আমলগুলি ছুতে গেলেও] যথেষ্ট হবে।
🌳৩. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা (১ বার):
বিছানায় শোয়ার পর আয়াতুল কুরসি পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা হেফাজত করে এবং শয়তান কাছে আসতে পারে না। [সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫০১০]
আল্লাহু লা--ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তাখুজুহু সিনাতুউ ওয়ালা নাউম। লাহুমা ফিস সা-মা-ওয়া-তি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফা’উ ইন্দাহু-- ইল্লা বি’ইযনিহী-, ইয়া’লামু-মা বায়না আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহী- ইল্লা- বিমা শা--আ, ওয়াছিয়া কুরসিয়্যুহুস সা-মা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়া’উ দুহু হিফজুহুমা ওয়া হুয়াল আলিয়্যুল আজীম।
🌳৪. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস – প্রতিটি ৩ বার পড়ে ফুঁ দেওয়া:
দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মুছে দেওয়া (তিনকুল)। এটা রাসূল (সা.) নিয়মিত করতেন। শয়তান ও বিভিন্ন ক্ষতি (জাদুটোনা ও অনিষ্ট) থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
[বুখারী ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫০১৮, ৫৭৩৫, ৫৭৪৮, ৫৭৫১, ৬৩১৯, মুসলিম ২১৯২, ৩৯০২, ইবনু মাজাহ ৩৫৯২, আহমাদ ২৪২০৭, ২৪৩১০, ২৪৪০৬, ২৪৮০৭, ২৪৯৫৫, ২৫৬৫৭, ২৫৭৩১, মুওয়াত্তা মালিক ১৭৫৫, রিয়াদুস সলেহিন ১৪৬৯]
🌳৫. [১ বার] সুরা ইখলাস
এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পাঠের ছওয়াব পাবে। [তিরমিজি ২৮৯৬]
পাঠকারীর জন্য জান্নাত ওয়াজিব [অবধারিত] হয়ে যায়। [তিরমিজি ২৮৯৭]
এ সূরাটির মধ্যে রয়েছে শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা। [তিরমিজি, হাদিস: ৩৪০৩ – হাসান সহীহ]
🌳৬. [১ বার] সূরা কাফিরুন
এক-চতুর্থাংশ কুরআন পাঠের ছওয়াব পাবে। [তিরমিজি ২৮৯৪]
🌳৭. সূরা মুলক তিলাওয়াত করা:
যে ব্যক্তি রাতে এই সূরাটি পাঠ করবে, এটি কবরের আজাব থেকে তাকে রক্ষা করবে এবং কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। [তিরমিজি]
🌳৮. তাসবীহ পড়া: সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৩ বার (মোট ৯৯, শেষে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু... ১ বার)
এটা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ, ঘুমের আগে পড়লে গুনাহ মাফ হয়। [সহীহ বুখারি ও মুসলিম]
ফযিলতঃ
যে ব্যক্তি শয্যা গ্রহণকালে উক্ত তাসবীহে ফাতিমী পড়বে, তার জন্য সকল আমল থেকে উত্তম হবে।
এটি সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে এবং শরীরকে শক্তিশালী করে। হযরত ফাতেমা [রা.]-কে নবীজী [সাঃ] এই আমল শিখিয়েছিলেন।
রাসূল [সাঃ] বলেন, ১০০ বার বললে তা মীযানে ১০০০ এ রুপান্তর হবে। তোমাদের মাঝে কে এক দিন ও এক রাতে দু্ই হাজার পাঁচশত গুনাহে লিপ্ত হয়? [অর্থাৎ এতগুলো পাপও ক্ষমাযোগ্য হবে]। তোমাদের কেউ শোয়ার জন্য শয্যা গ্রহণ করলে শয়তান তার নিকট এসে তাকে ঘুম পাড়ায় এবং সে তাসবীহ না পাঠ করেই ঘুমিয়ে পড়ে। [তিরমিজি ৩৪১০, ইবনু মাজাহ ৯২৬]
প্রত্যেক তাসবীহ, তাহমীদ ও আকবীর তার জন্য একটি করে সাদকাতুল্য হবে।
[বুখারী ৩১১৩, ৩৭০৫, ৫৩৬১, ৫৩৬২, ৬৩১৮, মুসলিম ২৭২৭, তিরমিজি ৩৪০৮, ৩৪০৯, আবূ দাউদ ২৯৮৮, ৫০৬২, আহমাদ ৬০৫, ৭৪২, ৮৪০, ৯৯৯, ১১৪৪, ১২৩৩, ১২৫৩, ১৩১৫, দারেমী ২৬৮৫, রিয়াদুস সলেহিন ১৪৬৭]
🌳৯. ডান কাতে শোয়া
রাসূল [সাঃ] সবসময় ডান কাতে গালের নিচে ডান হাত রেখে ঘুমাতেন। এটি স্বাস্থ্যের জন্য এবং সুন্নাহ পালনের জন্য উত্তম। [সহীহ বুখারি]
🌳১০. ঘুমের দোয়া পড়া:
বিসমিকাল্লাহুম্মা আহ্ইয়াহ ওয়া আমূতু
অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার নামেই আমি বাঁচি ও মরি।
[বুখারী ৬৩১২, ৬৩১৪, ৬৩২৪, ৭৩৯৪, তিরমিজি ৩৪১৭, আবূ দাউদ ৫০৪৯, ইবনু মাজাহ ৩৮৮০, আহমাদ ২২৭৩৩, ২২৭৬০, ২২৭৭৫, ২২৮৬০, ২২৯৪৯, দারেমী ২৬৮৬, রিয়াদুস সলেহিন ১৪৬৬]
অতঃপর ৩ বার পড়বে –
আল্লাহুম্মা কিনী আযাবাকা ইয়াওমা তাবআসু ইবাদাকা
অতঃপর সর্বশেষ নিচের দু’আটি পড়ে ঘুমাবে –
আল্লাহুম্মা আসলামতু নাফসী ইলাইক, ওয়া ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহী ইলাইক, ওয়া ফাও ওয়াদতু আমরি ইলাইক, ওয়া আলজা'তু জাহরি ইলাইক, রাগবাতান ওয়া রাহবাতান ইলাইক, লা-মালযা’আ ওয়ালা মানযা মিনকা ইল্লা ইলাইক, আমানতু বিকিতা বিকা আল্লাজি আনযালতা, ওয়াবি নাবী’'ইকা আল্লাজী আরসালাত।
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি চেহারাকে [সমস্ত অংগ-প্রত্যংগকে] আপনার কাছে সমর্পন করলাম। আর আমার সকল বিষয় আপনার কাছেই সমর্পণ করলাম এবং আমার পৃষ্ঠদেশ আপনার আশ্রয়ে সোপর্দ করলাম। আমি আপনার গজবের ভয়ে ভীত এবং আপনার রহমতের আশায় আশান্বিত। আপনার নিকট ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই এবং নেই মুক্তি পাওয়ার স্থান। আপনি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তার উপর ঈমান এনেছি এবং আপনি যে নবি পাঠিয়েছেন আমি তার উপর ঈমান এনেছি।
[বুখারী ২৪৭, ৬৩১৩, ৬৩১৫, ৭৪৮৮, মুসলিম ২৭১০, তিরমিজি ৩৩৯৪, ৩৫৭৪, আবূ দাউদ ৫০৫৬, ইবনু মাজাহ ৩৮৭৬, আহমাদ ১৮০৪৪, ১৮০৮৯, ১৮১১৪, ১৮১৪৩, ১৮১৭৭, ১৮২০৫, দারেমী ২৬৮৩, রিয়াদুস সলেহিন ১৪৭০]
🌳১১. সবাইকে ক্ষমা করে ঘুমানোঃ
ঘুমানোর আগে মনে মনে সবাইকে ক্ষমা করে দিন। বলুন— "ইয়া আল্লাহ, আজ যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে আমি সবাইকে মাফ করে দিলাম।" এতে আপনার অন্তর প্রশান্ত হবে এবং আল্লাহ আপনাকেও মাফ করবেন।
🌳১২. তাহাজ্জুদের জন্য শেষরাতে উঠার নিয়ত করে ঘুমানো।
🌳১৩. [৩ বার] ইস্তেগফার
ইস্তিগফার পড়া (যেমন: আস্তাগফিরুল্লাহ – ১০০ বার বা যতটা পারা যায়)
গুনাহ মাফের জন্য খুবই উত্তম।
আস্তাগফিরুল্লা-হ আল আযীম আল্লাযী লা-ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতুবু ইলাইহী।
🌳১৪. দরূদ শরীফ পড়া (যতবার সম্ভব, অন্তত ১০ বার)
দরূদ পড়ে ঘুমালে মৃত্যুর পর দরূদ সুপারিশকারী হয়।
🌳১৫. কালিমা তাইয়্যিবা পড়া (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু... অন্তত ১০০ বার বা যতটা সম্ভব)
কালিমা পড়ে ঘুমালে মৃত্যু হলে শহীদি মৃত্যুর সওয়াব পাওয়া যায় বলে অনেক আলেম উল্লেখ করেন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন