কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা

 🚫🚫‼️কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা


সূরা আন-নিসা: আয়াত ৩১ 


আরবি :إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا


বাংলা উচ্চারণ: ইন তাজ্ তা-নিবূ কা-বা-য়িরা মা- তুন্ হাওনা 'আন্হু নুক কাফ্ ফির 'আন্কুম সায়্যিআ-তিকুম ওয়া নুদখিল্কুম মুদ্খালা-ন কারী-মা-।


বাংলা অর্থ:"তোমরা যদি সেই বড় বড় গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যেগুলো তোমাদের থেকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের ছোট ছোট গুনাহসমূহ মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাবো।”


এই আয়াতটি যেহেতু কবীরা গুনাহ (বড় বড় গুনাহ) থেকে বিরত থাকার শর্তে সগীরা গুনাহ (ছোট পাপ) ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছে, তাই এর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় কবীরা গুনাহের ধারণা, তালিকা এবং ক্ষমা পাওয়ার প্রক্রিয়া  আলোচনা করা হলো।


🙏🙏এই আয়াতটি ব্যাখ্যা একটু বিশদভাবে করার চেষ্টা করেছি, কারণ আখিরাতে বিচার হবে পাপ এবং পূর্ণের , আর পাপের/গুনাহ ধরন ( কবীরা, সগীরা) অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবেI তাই পাপ থেকে বাঁচতে হলে পাপগুলো চিনতে হবেI


১. কবীরা গুনাহের সংজ্ঞা ও চিহ্ন:


কবীরা গুনাহ হলো সেটাই, যার জন্য কুরআন বা হাদীসে কঠিন শাস্তি বা অভিশাপের কথা বলা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলেমরা কবীরা গুনাহকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট চিহ্ন নির্ধারণ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.)-এর মতে, এমন প্রত্যেক পাপই কবীরা গুনাহ, যার পরিণতিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর যেকোনো একটি উল্লেখ আছে:


জাহান্নামের ভয় দেখানো: যে কাজের জন্য কুরআন ও হাদীসে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।


আল্লাহর ক্রোধ/গজবের কথা: যে কাজের জন্য আল্লাহ তাআলার ক্রোধ বা অসন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে।


লা'নত (অভিশাপ): যে কাজ করলে আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (সা.) অভিশাপ করেছেন।


শারীরিক দণ্ড (হদ্দ): যে পাপের জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট শাস্তি (যেমন চুরির জন্য হাত কাটা, যিনার জন্য বেত্রাঘাত বা রজম ইত্যাদি) নির্ধারিত রয়েছে।


ইমানদার না থাকার ঘোষণা: হাদীসে কোনো কাজ করার পর বলা হয়েছে, "সে আমার দলভুক্ত নয়" বা "সে মুমিন নয়।"


কবীরা গুনাহের সংখ্যা:


কবীরা গুনাহের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা কুরআন বা হাদীসে সুনির্দিষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়নি। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কিছু হাদীসে সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ-এর কথা উল্লেখ করেছেন। 


এই সাতটি ছাড়াও অন্যান্য হাদীস ও কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করে ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-কাবায়ের'-এ ৭০টিরও বেশি কবীরা গুনাহের তালিকা করেছেন। (পরে বিশদভাবে এই ৭০ টি ব্যাখ্যা করব)


২. কুরআনে উল্লেখিত প্রধান কবীরা গুনাহসমূহ


হাদীসের আলোকে সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক সাতটি কবীরা গুনাহ (সাতটি 'মুবি ক্বাত') হলো:


১. তাওহীদ- শির্ক করা (আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা)। এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ, যা তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না। সূরা আন-নিসা (৪): ৪৮ "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না, এ ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।"


২. যাদু- যাদু ও টোনা করা বা এর চর্চা করা। সূরা আল-বাকারা (২):  ১০২ "আর তারা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা আবৃত্তি করত, তার অনুসরণ করত...। বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত...। আর তারা অবশ্যই জানত যে, যে কেউ তা (যাদু) খরিদ করে, আখিরাতে তার কোনো অংশ নেই।"


৩. জীবন-অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা। রা বনী ইসরাঈল (১৭): ৩৩ "আর তোমরা সেই নাফসকে হত্যা করো না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া।"


৪. ইয়াতীমের সম্পদ- ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ বা অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা।সূরা আন-নিসা (৪): ১০"যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের ধন-সম্পদ গ্রাস করে, তারা তো তাদের পেটে আগুনই ভর্তি করে..."


৫. সম্পদ ও লেনদেন- সূদ  খাওয়া বা এর লেনদেন করা। সূরা আল-বাকারা (২): ২৭৬"আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।"


৬. জিহাদ- যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা (বিশেষ শর্ত ছাড়া)।সূরা আল-আনফাল (৮): ১৬ "আর যে ব্যক্তি সেদিন যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন বা নিজ দলে আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, সে তো আল্লাহর ক্রোধ নিয়ে ফিরে এল এবং তার আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!"


৭. সম্মা-সতী-সাধ্বী মুমিন মহিলাকে অপবাদ দেওয়া (যিনার মিথ্যা অভিযোগ)।সূরা আন-নূর (২৪): ২৩ "নিশ্চয়ই যারা সচ্চরিত্রবান, সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।"


অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কবীরা গুনাহ


↪️ফরয ইবাদত পরিত্যাগ: বিনা ওজরে সালাত (নামাজ), যাকাত, রোযা বা হজ (সক্ষম থাকা সত্ত্বেও) পরিত্যাগ করা। সূরা মারইয়াম (১৯): ৫৯ অতঃপর তাদের পরে এলো অপদার্থ বংশধর, যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং (কুপ্রবৃত্তির) কামনা-বাসনার অনুসরণ করল। সুতরাং তারা অচিরেই 'গাই' নামক জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। 


↪️পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা।সূরা বনী ইসরাঈল (১৭): ২৩""আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তুমি তাদেরকে 'উহ্' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।"


↪️মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।সূরা আল-হাজ্জ (২২): ৩০"...সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং তোমরা মিথ্যা কথা (ক্বাওলায যূর) থেকে বিরত থাকো।"শিরকের সাথে তুলনা: হাদীসে রাসূল (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার সমতুল্য মহাপাপ বলে ঘোষণা করেছেন। এই আয়াতে মূর্তিপূজার মতো নিকৃষ্ট কাজের পরই মিথ্যা কথা (ক্বাওলায যূর) থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়ায় এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিথ্যা সাক্ষ্য, যা অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তা 'ক্বাওলায যূর'-এর অন্তর্ভুক্ত।


↪️যিনা (ব্যভিচার) ও সমকামিতা।সূরা বনী ইসরাঈল (১৭): ৩২ "আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।"


↪️মদ পান করা ও জুয়া খেলা।সূরা আল-বাকারাহ (২): ২১৯ "লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, 'ঐ দু'টোতে আছে মহাপাপ (ইছমুন কাবীর) এবং মানুষের জন্য উপকারও, কিন্তু এ দু'টোর পাপ এদের উপকার অপেক্ষা অনেক বেশি বড়'।"


↪️চুরি ও ডাকাতি করা।সূরা আল-মায়েদা (৫): ৩৮ "যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও—তাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"


↪️মিথ্যা কসম করা। সূরা আলে-ইমরান (৩):  ৭৭ "নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য খরিদ করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিপাতও করবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।" সূরা আল-কলম (৬৮): ১০ আর আপনি এমন কারো আনুগত্য করবেন না, যে বেশি বেশি কসম খায়, যে লাঞ্ছিত।"


↪️আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা।সূরা মুহাম্মাদ (৪৭): ২২-২৩ "(হে মুনাফিকরা!) তোমরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। ওরা তারাই, যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেছেন।"


৩. কবীরা ও সগীরা গুনাহের ক্ষমার প্রক্রিয়া:


সূরা নিসার ৩১ নম্বর আয়াতটি মুমিনদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এখানে ক্ষমার শর্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে:


ক. কবীরা গুনাহ ক্ষমার শর্ত


কবীরা গুনাহ একমাত্র তাওবা (অনুশোচনা) ছাড়া মাফ হয় না। তাওবার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:


লজ্জিত হওয়া: কৃতকর্মের জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া।


বিরত থাকা: অবিলম্বে সেই পাপ কাজ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেওয়া।


প্রতিজ্ঞা করা: ভবিষ্যতে সেই পাপে আর ফিরে না আসার দৃঢ় সংকল্প করা।


যদি গুনাহটি অন্য কোনো মানুষের অধিকারের (যেমন টাকা-পয়সা, সম্মান) সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে চতুর্থ শর্ত হিসেবে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।


খ. সগীরা গুনাহ ক্ষমার প্রক্রিয়া:


এই আয়াত অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কবীরা গুনাহগুলো এড়িয়ে চলে, আল্লাহ তার সগীরা গুনাহগুলো এমনিতেই ক্ষমা করে দেন। এছাড়া, হাদীস অনুসারে কিছু নেক আমলের মাধ্যমেও সগীরা গুনাহ মাফ হয়, যদি কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়।


সগীরা গুনাহ মাফের কিছু মাধ্যম:


পাঁচ ওয়াক্ত সালাত: এক সালাত থেকে আরেক সালাতের মধ্যবর্তী সগীরা গুনাহ মাফ করে দেয়।


জুমআর সালাত: এক জুমআ থেকে আরেক জুমআর মধ্যবর্তী সগীরা গুনাহের কাফফারা।


রমজানের রোজা: কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে রমজানের রোজা গুনাহের কাফফারা হয়।


ওযু: সঠিকভাবে ওযু করলে প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সাথে সাথে পাপগুলো ঝরে যায়।


গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:


যদি কেউ ছোট পাপকে তুচ্ছ বা হালকা মনে করে বারবার করতে থাকে এবং তার জন্য অনুতপ্ত না হয়, তবে সেই ছোট পাপও কবীরা গুনাহের রূপ নিতে পারে। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো সব ধরণের পাপ থেকে সাবধানে থাকা।


এই আয়াতটি মূলত মুমিনদেরকে আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, বড় পাপের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে যারা তা থেকে দূরে থাকবে, তাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটি আল্লাহ তাঁর অপার দয়া ও অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের জন্য জান্নাতের সম্মানজনক স্থান প্রস্তুত রাখবেন।


🙏🙏শেয়ার করে  মুসলিম উম্মাহকে গুনাহ থেকে বাঁচার সঠিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিন🙏🙏

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন