⛔ প্রশ্ন: চার মাজহাব অনুসরণ না করলে কি কোনো সমস্যা হবে...?
উত্তর: প্রতিটি মুসলিম কুরআন ও সুন্নাহ মানতে বাধ্য। কিন্তু প্রচলিত চার মাযহাবের কোন মাযহাব মানতে মোটেও বাধ্য নয়।
যেহেতু এমন বাধ্যবাধকতা আল্লাহ, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীরা করেন নাই।
মাযহাব পালনের ক্ষেত্রে মাযহাবের ইমামগণের কিছু মূলনীতি ও উপদেশ রয়েছে, তা আমরা অনেকেই জানি না। বিশেষ করে মতবিরোধপূর্ণ মাসআলাগুলোতে তথ্যসূত্র দুর্বল হলেও নিজ নিজ মাযহাবের রায় অন্ধভাবে মেনে চলি অনেকেই। এমন অনুসরণের অনুমতি কি আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমাদেরকে দিয়েছেন?
কোন বিষয়ে দুর্বল হাদীস আমল করা, অথচ একই বিষয়ে প্রাপ্ত বিশুদ্ধ হাদীসটি আমলে না আনা- এমন অদ্ভুত, অযৌক্তিক আমলের নির্দেশ কি মাযহাবের ইমামগণ আমাদেরকে দিয়েছেন? এ বিষয়ে তাঁরা আমাদেরকে কী উপদেশ দিয়েছেন, এতদসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী নিম্নে তুলে ধরা হলো।
১. ইমাম আবু হানীফা (র) বলেন, “হাদীস যেটি সহীহ সেটাই আমার মাযহাব ”।
(রাদ্দুল মুখতার ১/১৫৪; মুকাদ্দিমাতু উমদাতুর রিয়ায়াহ- ১/১৪; হাশিয়াতু ইবনু আবেদীখ- ১/৬৩)।
২. ইমাম মালেক (র) বলেন, “আমি নিছক একজন মানুষ। ভুল করি, শুদ্ধও করি। তাই আমার মতামতকে যাচাই করে নিও। কুরআন ও সুন্নাহর সাথে যতটুকু মিলে সেটুকু গ্রহণ করো, আর গড়মিল পেলে সেটুকু বাদ দিয়ে দিও।”
(ইকাযুল হিমাম, পৃষ্ঠা ১০২)
৩. ইমাম শাফেয়ী (র) বলেন, “যদি তোমরা আমার কোন কথা হাদীসের সাথে গড়মিল দেখতে পাও, তাহলে তোমরা হাদিস অনুযায়ী আমল করো, আমার নিজের উক্তিকে দেয়ালে ছুড়ে ফেল।”
(হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ- ১/৩৫৭)।
৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বলেন, “তুমি আমার অন্ধ অনুসরণ করো না। মালেক, শাফেয়ী, আওযায়ী, সাওরী- তাঁদেরও না; বরং তাঁরা যেখান থেকে (সমাধান) নিয়েছেন তুমিও সেখান থেকেই নাও।”
(ইবনুল কাইয়্যিম রচিত ‘ঈলামুল মুওয়াকেয়ীন- ২/৩০২)।
তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি রাসূল (স)-এর সহীহ হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করবে সে লোক ধ্ব/সের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।”
(ইবনুল জাওযী রচিত, আল মানাকিব: ১৮২)
৫. আল্লামা ইবনে আবেদীন বলেন, “কোন মাসআলা সহীহ হাদীসের সাথে গড়মিল হলে ঐ হাদীসটিই আমল করবে । আর ঐ হাদীসই হবে তার মাযহাব। এরূপ আমল তাকে মাযহাব থেকে বের করে দেব না। হানাফী হলে সে হানাফীই থেকে যাবে।”
(রাদ্দুল মুখতার- ১/১৫৪)
৬. সুনানে আবী দাউদ গ্রন্থের সংকলক মুহাদ্দিস আবু দাউদ (র) বলেন, এমন কোন লোক নেই, যার সব কথাই গ্রহণযোগ্য; কেবল রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া। (মাসাইলে ইমাম আহমদ: ২৭৬)
সর্বশেষে আল্লাহ তাআলার বাণীটি স্মরণ করি। তিনি বলেছেন,
“যারা (সব) কথা শুনে, অতঃপর উত্তমটি আমল করে তারাই হলো হেদায়াতপ্রাপ্ত, আর তারাই হলো বুদ্ধিমান।”
(সূরা ৩৯; আয যুমার ১৮)
কোরআন হাদীস বাদ দিয়ে অন্য কোথাও ইসলাম খুঁজে বেড়ানো মানে পথভ্রষ্টতার লক্ষণ!
মহান আল্লাহ বলেনঃ
(১) আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম সম্পূর্ণ করলাম এবং আমার নেয়ামত তোমার উপর পরিপূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে পছন্দ করলাম। (সূরা মায়েদাহ- ৫/৩)।
(২) ‘তারা কী আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন চায়? যখন আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সমস্তই ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই তারা প্রত্যাবর্তিত হবে’।
(সূরা আলে ইমরান ৩/৮৩)।
(৩) ‘বলুন! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তো কাফেরদেরকে পচন্দ করেন না’।
(সূরা আলে ইমরান ৩/৩২)।
(৪) ‘তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পার’।
(সুরা আলে ইমরান ৩/১৩২)।
(৫) ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর এবং সতর্ক হও; যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ, আমাদের রাসূলের একমাত্র কর্তব্য শুধু প্রচার করা’।
(সুরা মায়েদাহ- ৫/৯২)।
(৬) ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তার কথা শ্রবণ করছ, তখন তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না’।
(সুরা আনফাল ৮/২০)।
(৭) ‘তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনলাম এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম; কিন্তু এর পর তাদের একদল মুখ ফিুরিয়ে নেয়; বস্ত্ততঃ তারা মুমিন নয়’।
(সুরা নূর ২৪/৪৭)।
(৮) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর (তাদের অমান্য করে) তোমাদের কর্ম বিনষ্ট কর না’।
(সুরা মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)।
(৯) ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা শোন, মেনে নাও ও ব্যয় কর তোমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্য; যারা তাদের অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম’।
(সুরা তাগাবুন ৬৪/১৬)।
(১০) ‘এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। অতএব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; যেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটা মহাসাফল্য’।
(সুরা নিসা ৪/১৩)।
(১১) ‘যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করল সে ঐ ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে, যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নবীগণ, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী’।
(সুরা নিসা ৪/৬৯)।
(১২) ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। তোমরা ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন’।
(সুরা আনফাল ৮/৪৬)।
বিদআত বলা হয় দ্বীন ও ইবাদতে নব আবিষ্কৃত কাজকে। অর্থাৎ দ্বীন বা ইবাদত মনে করে করা এমন কাজকে বিদআত বলা হবে, যে কাজের কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর কোন দলীল নেই।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন,
“তোমরা (দ্বীন) নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” ৮১ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)
“যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল--- যা তাঁর মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” ৮২ (বুখারী ও মুসলিম)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন