সালমান আল-ফারসী (রাঃ)

 সালমান আল-ফারসী (রাঃ) পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার পরিবার ছিল জোরোস্ট্রিয়ানিজম (Zoroastrianism) বা পারস্যের প্রাচীন অগ্নি উপাসক ধর্মের অনুসারী। আরবিতে এদের 'মাজুস' (Majus) বলা হয়। সালমান যখন এক খ্রিস্টান গির্জায় প্রার্থনা দেখলেন, তিনি এর তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন।


তিনি বিশেষ করে নেস্টোরিয়ান (Nestorian) সম্প্রদায়ের দিকে কেন ঝুঁকলেন? ড. কাযী ব্যাখ্যা করেন যে, তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে যখন ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন নেস্টোরিয়ানরা বিশ্বাস করতো ঈসা (আঃ) ছিলেন একজন মানুষ যাকে আল্লাহ মনোনীত করেছেন। এই মতবাদটি মূল তাওহীদের অনেক কাছাকাছি ছিল। রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন যখন এই মতবাদ নিষিদ্ধ করেন, তখন নেস্টোরিয়ানরা পারস্যে পালিয়ে আসে। এভাবেই সালমান (রাঃ) এমন এক ধর্মের দেখা পেলেন যা প্রচলিত পৌত্তলিকতার চেয়ে অনেক বেশি যৌক্তিক ছিল।


সত্যের খোজে তিনি যখন প্রথম পাদ্রীর সাথে থাকতে শুরু করলেন, তিনি আবিষ্কার করলেন যে সেই পাদ্রী ছিল চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। সে মানুষের কাছ থেকে সাদাকাহ বা দান সংগ্রহ করে তা দরিদ্রদের না দিয়ে নিজের জন্য লুকিয়ে রাখত।


সাধারণ মানুষ এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে ধর্মই ছেড়ে দিত। কিন্তু সালমান (রাঃ) জানতেন—ব্যক্তির দোষ ধর্মের দোষ নয়। তিনি পাদ্রীর মৃত্যুর পর সাহসের সাথে তার ভণ্ডামি উন্মোচন করেন এবং লুকিয়ে রাখা সাত কলস সোনা-রুপা বের করে দেখান। এর ফলে সালমান (রাঃ) সেই সমাজের সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।


ড. ক্বাদি একটি চমৎকার পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সালমান (রাঃ) এক পাদ্রীর মৃত্যুর পর আরেকজনের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়া, মসুল, নুসাইবিন হয়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে আসছিলেন। প্রতিটি নতুন শহর তাকে ভৌগোলিকভাবে আরব উপদ্বীপের (Arabian Peninsula) সীমান্তের আরও কাছে নিয়ে আসছিল। সালমান নিজেও জানতেন না যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে ধাপে ধাপে শেষ নবীর দিকেই নিয়ে যাচ্ছেন।


তার শেষ পাদ্রী একজন মহৎ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সালমানকে বললেন, "এখন এমন সময় এসেছে যখন একজন নতুন নবীর আবির্ভাব হবে। সেই নবী আরব উপদ্বীপের খেজুর বাগানে ঘেরা এক ভূমিতে হিজরত করবেন।" আর তিনি সালমানের হাতে তুলে দিলেন তিনটি নিদর্শন, যা দিয়ে সেই নবীকে চেনা যাবে:


১. তিনি সাদাকাহ (দান) গ্রহণ করবেন না, খাবেনও না। 

২. তিনি হাদিয়া (উপহার) গ্রহণ করবেন এবং খাবেন। 

৩. তার দুই কাঁধের মাঝখানে নবুওয়াতের মোহর থাকবে।


অবশেষে সালমান তার সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে আরবের এক কাফেলার সাথে যাত্রা করলেন। কিন্তু মাঝপথে তারা তাকে প্রতারণা করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিল!


কল্পনা করুন, একজন স্বাধীন শিক্ষিত মানুষ, যিনি এক সময় পারস্যের অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন, তিনি আজ মদিনার এক খেজুর বাগানে অন্যের দাস! কিন্তু ড. কাযী বলেন, সালমানের ঈমান ছিল পাথরের মতো শক্ত। তিনি যখন মদিনার খেজুর গাছ দেখলেন, তার মন বলে উঠলো—"এটাই সেই জায়গা, যার কথা আমার শিক্ষক বলেছিলেন।"


তারপর কী হলো? যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদিনায় হিজরত করলেন, সালমান তাকে পরীক্ষা করলেন। প্রথমত, তিনি কিছু খেজুর নিয়ে নবীর কাছে গেলেন এবং বললেন, "এগুলো সাদাকাহ।" নবী (সাঃ) সেগুলো স্পর্শও করলেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি আবার খেজুর নিয়ে গেলেন এবং বললেন, "এগুলো হাদিয়া।" এবার নবীজি (সাঃ) সেগুলো গ্রহণ করলেন এবং সাহাবাদের সাথে খেলেন। সালমান আল-ফারসী (রাঃ) এর মনে তখন এক দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো। শেষ নিদর্শনের জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন।


একদিন জানাযার সময় সালমান (রাঃ) খুব উৎসুকভাবে নবীজি (সাঃ)-এর পেছনে হাঁটছিলেন। তিনি কোনোভাবে পিঠের সেই মোহরটি দেখার চেষ্টা করছিলেন। আমাদের দয়ালু নবী (সাঃ) সাথে সাথে বুঝে ফেললেন যে এই লোকটির আচরণ সাধারণ কারো মতো নয়; সে নিশ্চয়ই কোনো কিছুর সন্ধান করছে। নবীজি (সাঃ) জানতেন যে আগের কিতাবগুলোতে তার শারীরিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ আছে। তাই সালমানকে সাহায্য করার জন্য নবীজি (সাঃ) স্বেচ্ছায় নিজের চাদরটি পিঠ থেকে কিছুটা নিচে নামিয়ে দিলেন, যেন সালমান সেই নিদর্শনটি স্পষ্টভাবে দেখতে পান।


সালমান (রাঃ) যখন সেই মোহরটি দেখলেন, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং নবীজিকে জড়িয়ে ধরলেন। নবীজি (সাঃ) তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে এই মানুষটি কোনো সাধারণ মানুষ নন—তিনি নিশ্চয়ই অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আসা কোনো মহান সত্যসন্ধানী।


নবীজি (সাঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার গল্পটি কী হে সালমান?" কারণ যীশুখ্রিস্ট বা ঈসা (আঃ)-এর প্রকৃত অনুসারীদের সিলসিলা ছাড়া আর কারো এই বিশেষ নিদর্শনের কথা জানার কথা ছিল না। সালমান (রাঃ) যখন তার দীর্ঘ কয়েক দশকের কষ্টের কাহিনী শোনালেন, নবীজি (সাঃ) এতটাই মুগ্ধ হলেন যে তিনি সালমানকে বললেন মসজিদে এসে সবার সামনে তার এই কাহিনী শোনাতে, যেন সাহাবীদের ঈমান আরও মজবুত হয়।


নবীজি (সাঃ) শুধু তার গল্প শুনেই থেমে থাকেননি, তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সালমানকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। তিনি সাহাবীদের নিয়ে একটি 'তহবিল' বা ফান্ডরেইজার গঠন করেন এবং সালমানকে মুক্ত করতে মালিকের শর্ত অনুযায়ী ৩০০ খেজুর গাছ লাগানোর কাজে স্বয়ং নিজের হাত দিয়ে সাহায্য করেন।


হিজরতের কয়েক বছর পর মদিনার ওপর যখন কুরাইশ এবং তাদের মিত্রদের বিশাল বাহিনী আক্রমণের পরিকল্পনা করলো, তখন সাহাবীদের মধ্যে এক ধরণের উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ শত্রুপক্ষের শক্তি ছিল বহুগুণ বেশি। এই সংকটময় মুহূর্তে সালমান আল-ফারসী (রাঃ) একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিলেন।


তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, পারস্যে আমাদের ওপর যখন কোনো বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ করতো, আমরা তখন নিজেদের রক্ষার জন্য মাটির নিচে গর্ত বা পরিখা খুঁড়তাম।" আরবরা আগে কখনো এই ধরণের সামরিক কৌশল বা 'Trench Warfare' দেখেনি। নবীজি (সাঃ) তার এই বুদ্ধি সাদরে গ্রহণ করলেন। সালমান (রাঃ)-এর এই উদ্ভাবনী চিন্তাই মদিনাকে সেই চরম বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল।


ড. ইয়াসির ক্বাদি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন—ইসলাম সবসময় বাইরের জ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে উদার ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত তা দ্বীনের বা ঈমানের কোনো মৌলিক বিষয়কে লঙ্ঘন না করে, ততক্ষণ আমরা অন্যদের সভ্যতা থেকেও ভালো কিছু গ্রহণ করতে পারি। সালমান (রাঃ) সেই 'গ্লোবাল নলেজ' বা বৈশ্বিক জ্ঞানের প্রথম বাহক ছিলেন।


নবীজি (সাঃ)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের বিজয় যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, তখন পারস্য সাম্রাজ্যও বিজিত হলো। সালমান (রাঃ) পারস্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত 'কাদিসিয়া যুদ্ধে' (Battle of Qadisiyah) অন্যতম প্রধান কমান্ডার হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।


কল্পনা করুন, যে কিশোর একদিন সত্যের সন্ধানে পারস্য থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, কয়েক দশক পর তিনি বিজয়ী বেশে সেই একই রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন! তাকে পারস্যের রাজধানী মাদাইন (Ctesiphon)-এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। তিনি ছিলেন পারস্যের প্রথম মুসলিম গভর্নর।


গভর্নর হওয়ার পরও সালমান (রাঃ) বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদে থাকতে অস্বীকার করেন। তিনি গাছের নিচে অথবা একটি ছোট কুঁড়েঘরে থাকতেন যা এতই ছোট ছিল যে দাঁড়ালে তার মাথা ছাদে লেগে যেত।


ড. ক্বাদি একটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ করেছেন—একবার এক বিদেশি বণিক মদিনায় এসে সালমানকে চিনতে না পেরে মজুর ভেবে তার পিঠে মাল উঠিয়ে দিয়েছিল। সালমান চুপচাপ মাল বহন করছিলেন। পরে যখন লোকজন তাকে 'গভর্নর' বলে সম্বোধন করলো, তখন সেই বণিক লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইলো। সালমান শুধু বললেন, "আমি তো তোমাকে সাহায্যের নিয়ত করেছি, এখন এই কাজ আমি শেষ করেই ছাড়বো।" এই ছিলেন সালমান আল-ফারসী (রাঃ)—যিনি সত্যের খোঁজে রাজকীয় জীবন ছেড়ে দাস হয়েছিলেন, আর আল্লাহ তাকে সেই দাসের জীবন থেকে তুলে এনে পুনরায় নিজের জন্মভূমির শাসক বানিয়েছিলেন।


সালমান আল-ফারসী (রাঃ) এর জীবন আমাদের শেখায় যে, যদি কেউ সততার সাথে আল্লাহর সন্ধান করে, আল্লাহ তাকে ঠিকই পথ দেখান, যতই বাধা আসুক না কেন। তার ধৈর্য, তার একাগ্রতা আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


পুরো ভিডিওর লিঙ্ক 

https://youtu.be/e4C384SEtXY?si=ZgJYCF0rvAQxotyF

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন