## সূরা আল-বাকারার ফযীলত ##
××××××××××××××××××××××××××××
সুরা বাকারা মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াত সংখ্যা হলো ২৮৬টি, কোরআন শরীফের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় সুরা। এই সুরা প্রথম পারা থেকে শুরু করে তিন নম্বর পারার আট পৃষ্ঠায় গিয়ে শেষ হয়েছে। ইসলামের মৌলিক নীতি, বিশ্বাস ও শরিয়তের বিধিবিধানের যতটুকু বিস্তারিত বর্ণনা সুরা বাকারায় করা হয়েছে, ততটুকু আলোচনা অন্য কোনো সুরায় করা হয়নি।
এই সুরার মধ্যে আয়াতুল কুরসি নামে যে আয়াতখানা তা কোরআনের অন্য সব আয়াত থেকে উত্তম এবং শেষের যে দুইখানা আয়াত আছে সেটাও মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ভাণ্ডার থেকে দেয়া হয়েছে। এই আয়াতেরও অনেক ফজিলত আছে।
সূরা বাকারার ফযীলত সম্পর্কে অনেক সহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম ইবনুল আরাবী (রহঃ) বলেন: সূরা বাকারাহ এক হাজার সংবাদ, এক হাজার আদেশ ও এক হাজার নিষেধ সম্বলিত একটি সূরা।
(তাফসীর ইবনে কাসীর, আহকামুল কুরআন ইবনুল আরাবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
সুরা বাকারার ৬৭ থেকে ৭৩নং পর্যন্ত আয়াতে একটি গাভীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যে গাভীটি জবেহ করার জন্য বনি ইসরাইলকে আদেশ করা হয়েছিল। সে হিসাবেই এ সুরার নাম সুরা বাকারা। আরবিতে বাকারা অর্থ গাভী (গরু)।
সুরা বাকারা সম্পর্কে কিছু ফজিলতঃ
===============================
★★ সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেন:-
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত কর না। কেননা যে বাড়িতে সূরা বাকারাহ পাঠ করা হয় তাতে শয়তান প্রবেশ করে না।”
(তিরমিযী হা: ২৮৭৭, সহীহ)
★★ হজরত আবু মাসউদ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:-
'' যে ব্যাক্তি সূরা বাকারার শেষ আয়াতদ্বয় রাতে পাঠ করবে তার জন্য তা যথেষ্ট হবে। রাবী আবদুর রহমান (রহ.) বলেন, পরে আমি আবু মাসউদ (রা.)-এর সাথে সাক্ষাত করলাম, তখন তিনি বায়তূল্লাহ তাওয়াফ করছিলেন। আমি তাকে এ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমাকে হাদীসটি শুনিয়ে দিলেন। ''
{ সহিহ মুসলিম, ১৭৫৩}
★★ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত :-
'' যখন জিবরাঈল (আ.) হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসা ছিলেন, তখন তিনি ওপরের থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। ফলে তিনি মাথা উঠালেন এবং বললেন, এটা আসমানের একটি দরজা, যা আজকে খোলা হয়েছে। এর আগে কখনও খোলা হয়নি। এরপর সেখান থেকে একজন ফেরেশতা অবতরণ করলেন, অতঃপর বললেন, এই ফেরেশতা আজকের আগে আর কখনও জমিনে অবতরণ করেনি। ফেরেশতা সালাম দিয়ে বললেন, দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যা আপনার আগে আর কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। একটি হলো ফাতেহাতুল কিতাব আর অন্যটি সুরা বাকারার শেষ আয়াত।'' {সহি মুসলিম ৮০৬ নাসাঈ ২/১৩৮}
★★ হজরত আবু উমামা বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি :-
'' তোমরা কোরআন পাঠ করো। কারণ কিয়ামতের দিন তা পাঠকারীর জন্য শাফায়াতকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরা অর্থাৎ সুরা বাকারা এবং সুরা আলে ইমরান পড়ো। কিয়ামতের দিন এ দুটি সুরা এমনভাবে আসবে যেন তা দুই খণ্ড মেঘ অথবা দুটি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাঁক উড়ন্ত পাখি, যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সুরা বাকারা পাঠ করো। এ সুরাটিকে গ্রহণ করা বরকতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কারণ।" -(মুসলিম, হাদিস : ১৭৫৯)
★★ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত :-
'' প্রতিটি জিনিসের একটি শীর্ষচূড়া থাকে। আর কোরআনের শীর্ষচূড়া হলো সুরা বাকারা। এতে এমন একটি আয়াত আছে, যা কোরআনের সব আয়াতের সরদার। তা হলো আয়াতুল কুরসি।'' (জামে তিরমিজি হাদিস ২৮৮১)
★★ হজরত আবুজর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:-
'' নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারাকে এমন দুই আয়াতের মাধ্যমে শেষ করেছেন, যা আমাকে তাঁর আরশের নিচের ভাণ্ডার থেকে দান করা হয়েছে। সুতরাং নিজেরা তা শিখো এবং তোমাদের স্ত্রী-সন্তানদের শেখাও, কেননা এই আয়াতগুলো হলো দোয়া-দুরুদ ও কোরআন।''
{মুসতাদরাকে হাকেম ২/৩১৫}
★★ হজরত নুমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন :-
'' নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা জমিন ও আসমান সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে একটি কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। তার থেকে দুটি আয়াত সুরা বাকারার মাধ্যমে শেষ করেছেন। যে ঘরে তিন দিন এটা পড়া হবে না, শয়তান সেই ঘরের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।''
{জামে তিরমিজি হাদিস নং-২৮৮৫, সহি ইবনে হিব্বান হাদিস নং-৭৮২}
★★ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:-
'' তোমাদের মধ্যে কাউকে যেন এরূপ না পাই যে, সে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে পড়তে থাকে, কিন্তু সে সূরা বাকারাহ তেলাওয়াত করে না। জেনে রেখ, যে ঘরে সূরা বাকারাহ তেলাওয়াত করা হয় সে ঘর থেকে শয়তান দ্রুত পালিয়ে যায়। সবচেয়ে খালি ও মূল্যহীন সেই ঘর, যে ঘরে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব (কুরআন) পাঠ করা হয় না।'' (নাসাঈ হা: ৯৬৩, হাদীসটি হাসান)
★★ উসাইদ বিন হুজাইর (রাঃ) একদা রাতে সূরা বাকারাহ পাঠ আরম্ভ করেন। তাঁর পাশেই বাঁধা ঘোড়াটি হঠাৎ করে লাফাতে শুরু করে। তিনি পাঠ বন্ধ করলে ঘোড়াও লাফানো বন্ধ করে দেয়। আবার তিনি পড়তে শুরু করেন এবং ঘোড়াও লাফাতে শুরু করে। তিনি পুনরায় পড়া বন্ধ করেন, ঘোড়াটিও স্তব্ধ হয়ে যায়। তৃতীয়বারও এরূপ ঘটে। তাঁর শিশু পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়ার পাশে শুয়ে ছিল। কাজেই তিনি ভয় করলেন যে, হয়তো ছেলের গায়ে আঘাত লেগে যাবে। সুতরাং তিনি পড়া বন্ধ করে ছেলেকে উঠিয়ে নেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করেন যে, ঘোড়ার চমকে ওঠার কারণ কী? সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনা শুনে বললেন: উসাইদ! তুমি পড়েই যেতে। উসাইদ (রাঃ) বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তৃতীয় বারের পরে প্রিয় পুত্র ইয়াহইয়ার কারণে আমি পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর আমি মাথা আকাশের দিকে উঠালে ছায়ার ন্যায় একটি আলোকিত জিনিস দেখতে পাই এবং মুহূর্তেই তা ওপরের দিকে উঠে শূন্যে মিশে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বললেন: তুমি কি জান সেটা কী ছিল? তাঁরা ছিলেন গগণবিহারী অগণিত জ্যোতির্ময় ফেরেশতা। তোমার (পড়ার) শব্দ শুনে তাঁরা নিকটে এসেছিলেন। যদি তুমি পড়া বন্ধ না করতে তাহলে তাঁরা সকাল পর্যন্ত এরূপ থাকতেন এবং মদীনার সকল লোক তা দেখে চোখ জুড়াতো। একজন ফেরেশতাও তাদের দৃষ্টির অন্তরাল হতেন না।''
(সহীহ বুখারী হা: ৫০১৮৮, সহীহ মুসলিম হা: ২১৯২)
★★ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
'' কিয়ামাতের দিন কুরআন তেলাওয়াতকারীদেরকে আহ্বান করা হবে। সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান (তেলাওয়াতকারীদের) অগ্রে অগ্রে চলবে মেঘের ছায়া বা পাখির মত। এরা জোরালোভাবে আল্লাহ তা‘আলার কাছে সুপারিশ করবে।" (সহীহ মুসলিম হা: ৫৫৩)
★★ জুবায়র ইবনু নুফায়র (রহ.) থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, নাওয়াস ইবনু সাম’আন কিলাবী (রা.) বলেছেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে
শুনেছি যে:-
'' কিয়ামতের দিন কোরআন ও কোরআন অনুযায়ী আমলকারীদের সামনে সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পেশ করা হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুটির জন্য তিনটি উপমা উল্লেখ করেছেন যেগুলো এখনও আমি ভুলে যাইনি। তিনি বললেন, সে দুঁটি যেন দুটি ’গামামা’ বাদল কিংবা দুঁটি কাল শামিয়ানা যার মাঝে রয়েছে দ্যুতি; কিংবা সে দুটি যেন পাখা বিস্তারকারী পাখীর দুঁটি ঝাঁক যারা তিলাওয়াতকারীদের জন্য সাহায্যকারী হবে।" (সহিহ মুসলিম, ১৭৪৯)
মহান আল্লাহতালা আমাদেরকে সঠিকভাবে বুঝবার এবং আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন