তায়াম্মুম
তায়াম্মুমের নির্দেশ খোদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَإِنْ كُنْتُمْ مَّرْضَى أَوْ عَلى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنْكُمْ مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لاَمَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوْا مَاءً فَتَيَمَّمُوْا صَعِيْداً طَيِّباً فَامْسَحُوْا بِوُجُوْهِكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ مِّنْهُ
অর্থাৎ, যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক, কিংবা তোমাদের মধ্যে কেউপায়খানা করে আসে অথবা তোমরা স্ত্রী-সঙ্গম কর, অতঃপর পানি না পাও, তাহলে পাক মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও; তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতকে মাটি দ্বারা মাসাহ্ কর---। (কুরআন মাজীদ ৫/৬)
সরল ও সহ্জ দ্বীনের নবী (ﷺ) বলেন, “সকল মানুষ (উম্মতের) উপর আমাদেরকে ৩টি বিষয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে; আমাদের কাতারকে করা হয়েছে ফিরিশ্তাবর্গের কাতারের মত, সারা পৃথিবীকে আমাদের জন্য মসজিদ করে দেওয়া হয়েছে এবং পানি না পাওয়া গেলে মাটিকে আমাদের জন্য পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ করা হয়েছে। (মুসলিম, মিশকাত ৫২৬নং)
তায়াম্মুম করার পদ্ধতি
শুদ্ধতম হাদীস অনুসারে তায়াম্মুম করার পদ্ধতি নিম্নরুপ:
(নিয়ত করার পর ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে) দুই হাতের চেটো মাটির উপর মারতে হবে। তারপর তুলে নিয়ে তার উপর ফুঁক দিয়ে অতিরিক্ত ধুলোবালি উড়িয়ে দিয়ে উভয় হাত দ্বারা মুখমণ্ডল মাসাহ্ করতে হবে। এরপর বামহাত দ্বারা ডানহাত কব্জি পর্যন্ত এবং শেষে ডানহাত দ্বারা বাম হাত কব্জি পর্যন্ত মাসাহ্ করতে হবে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৫২৮নং)
কোন্ কোন্ অবস্থায় তায়াম্মুম বৈধ?
১। একেবারেই পানি না পাওয়া গেলে অথবা পান করার মত থাকলে এবং ওযু-গোসলের জন্য যথেষ্ট পানি না পাওয়া গেলে।
হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) বলেন, আমরা নবী (ﷺ) এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। এক সময় তিনি লোকেদের নিয়ে নামায পড়লেন। যখন তিনি নামায শেষ করলেন, তখন দেখলেন একটি লোক একটু সরে পৃথক দাঁড়িয়ে আছে। সে জামাআতে নামাযও পড়েনি। তিনি তাকে বললেন, “কি কারণে তুমি জামাআতে নামায পড়লে না?” লোকটি বলল, ‘আমি নাপাকে আছি, আর পানিও নেই।’ তিনি বললেন, “পাক মাটি ব্যবহার কর। তোমার জন্য তাই যথেষ্ট।” (বুখারী, মুসলিম, সহীহ মিশকাত ৫২৭নং)
তিনি আরো বলেন, “দশ বছর যাবৎ পানি না পাওয়া গেলে মুসলিমের ওযুর উপকরণ হল পাক মাটি। পানি পাওয়া গেলে গোসল করে নেওয়া উচিৎ। আর এটা অবশ্যই উত্তম।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ, মিশকাত ৫৩০নং)
অবশ্য আশে-পাশে বা সঙ্গীদের কারো নিকট পানি আছে কি না, তা অবশ্যই দেখে নিতে হবে। যখন একান্ত পানি পাওয়ার কোন আশাই থাকবে না, তখন তায়া ম্মু ম করে নামায পড়তে হবে।
২। অসুস্থ থাকলে অথবা দেহে কোন প্রকার ক্ষত বা ঘা থাকলে এবং পানি ব্যবহারে তা বেড়ে যাওয়া বা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা হলে।
হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, একদা আমরা কোন সফরে বের হ্লাম। আমাদের মধ্যে এক ব্যক্তির মাথায় পাথরের আঘাত লেগে ক্ষত হয়েছিল। এরপর তার স্বপ্ন দোষও হল। সে সঙ্গীদেরকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার জন্য কি তায়াম্মুম বৈধ মনে কর?’ সকলে বলল, ‘তুমি পানি ব্যবহার করতে অক্ষম নও। অতএব তোমার জন্য আমরা তায়াম্মুম বৈধ মনে করি না।’ তা শুনে লোকটি গোসল করল এবং এর প্রতি ক্রি য়ায় সে মারা গেল। অতঃপর আমরা যখন নবী (ﷺ)-এর নিকট ফিরে এলাম তখন তাঁকে সেই লোকটার ঘটনা খুলে বললাম। তা শুনে তিনি বললেন, “ওরা ওকে মেরে ফেলল, আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুক! যদি ওরা জানত না, তবে জেনে কেন নেয়নি? অজ্ঞতার ওষুধ তো প্রশ্নই।” (সহীহ আবূদাঊদ, সুনান ৩২৫, ইবনে মাজাহ্, সুনান, দারাক্বুত্বনী, সুনান, মিশকাত ৫৩১নং)
৩। পানি অতিরিক্ত ঠান্ডা হলে এবং তাতে ওযু-গোসল করাতে অসুখ হবে বলে দৃঢ় আশঙ্কা হলে, পরন্তু পানি গরম করার সুযোগ বা ব্যবস্থা না থাকলে তায়াম্মুম বৈধ।
হযরত আম্র বিন আস (রাঃ) বলেন, যাতুস সালাসিল যুদ্ধ-সফরে এক শীতের রাতে আমার স্বপ্ন দোষ হল। আমার ভয় হল যে, যদি গোসল করি তাহলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। তাই আমি তায়াম্মুম করে সঙ্গীদেরকে নিয়ে (ইমাম হয়ে) ফজরের নামায পড়লাম। আমার সঙ্গীরা একথা নবী (ﷺ)-এর নিকটে উল্লেখ করলে তিনি বললেন, “হে আম্র! তুমি নাপাক অবস্থায় তোমার সঙ্গীদের ইমামতি করেছ?” আমি গোসল না করার কারণ তাঁকে বললাম। আরো বললাম যে, আল্লাহ তাআলার এ বাণীও আমি শুনেছি, তিনি বলেন, “তোমরা আত্মহ্ত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড় দয়াশীল।” (কুরআন মাজীদ ৪/২৯)
একথা শুনে তিনি হাসলেন এবং আর কিছুই বললেন না। (বুখারী, সহীহ আবূদাঊদ, সুনান ৩২৩নং, আহমাদ, মুসনাদ,হাকেম, মুস্তাদরাক, দারাক্বুত্বনী, সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ)
৪। পানি ব্যবহারে ক্ষতি না হলে এবং পানি নিকটবর্তী কোন জায়গায় থাকলেও তা আনতে জান, মাল বা ইজ্জতহানির আশঙ্কা হলে, পানি ব্যবহার করতে গিয়ে সফরের সঙ্গীদের সঙ্গ-ছাড়া হওয়ার ভয় হলে, বন্দী অবস্থায় থাকলে অথবা ( কুঁয়ো ইত্যাদি থেকে) পানি তোলার কোন ব্যবস্থা না থাকলে তায়াম্মুম করা বৈধ। কারণ উক্ত অবস্থাগুলো পানি না পাওয়ার মতই অবস্থা।
৫। পানি কাছে থাকলেও তা ওযুর জন্য ব্যবহার করলে পান করা, রান্না করা ইত্যাদি হবে না আশঙ্কা হলেও তায়াম্মুম বৈধ। (মুগনী, ফিকহুস সুন্নাহ্ উর্দু ১/৬১-৬২)
কিসে তায়াম্মুম হবে?
পবিত্র মাটি এবং তার শ্রেণীভুক্ত সকল বস্তু (যেমন, পাথর, বালি, কাঁকর, সিমেন্ট প্রভৃতি) দ্বারা তায়াম্মুম শুদ্ধ। ধুলাযুক্ত মাটি না পাওয়া গেলে ধুলাহীন পাথর বা বালিতে তায়াম্মুম বৈধ হবে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২১৮)
তায়াম্মুম কিসে নষ্ট হয়?
যে যে কারণে ওযু নষ্ট হয়, ঠিক সেই সেই কারণে তায়াম্মুমও নষ্ট হয়ে যায়। কারণ তায়াম্মুম হল ওযুর বিকল্প। এ ছাড়া যে অসুবিধার কারণে তায়াম্মুম করা হয়েছিল, সেই অসুবিধা দূর হয়ে গেলেই তায়াম্মুম নষ্ট হয়ে যায়। যেমন পানি না পাওয়ার কারণে তায়াম্মুম করলে পানি পাওয়ার সাথে সাথে তায়াম্মুম শেষ হয়ে যায়। অসুখের কারণে করলে, অসুখ দূর হয়ে যাওয়ার পর পরই আর তায়াম্মুম থাকে না। (ফিকহুস সুন্নাহ্ উর্দু ১/৬৩)
তায়াম্মুমের আনুষঙ্গিক মাসায়েল
খোঁজার পর পানি না পাওয়া গেলে আওয়াল অক্তেই তায়াম্মুম করে নামায পড়া উচিৎ। শেষ ওয়াক্ত পর্যন্ত পানির অপেক্ষা করা বা পানি খোঁজা জরুরী নয়। আওয়াল অক্তে নামায পড়ে শেষ অক্তে পানি পাওয়া গেলেও নামায পুনরায় পড়তে হবে না। (সি: সহীহ ৬/২৬৫-২৬৮)
পানি খোঁজাখুঁজি না করেই তায়াম্মুম করে নামায পড়লে এবং পানি তার আশে-পাশে মজুদ থাকলে নামায বাতিল গণ্য হবে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২২০)
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, দুই ব্যক্তি সফরে বের হল। নামাযের সময় হলে তাদের নিকট পানি না থাকার কারণে তায়াম্মুম করে উভয়েই নামায পড়ে নিল। অতঃপর ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পূর্বেই তারা পানি পেয়ে গেল। ওদের মধ্যে একজন পানি দ্বারা ওযু করে পুনরায় ঐ নামায ফিরিয়ে পড়ল। কিন্তু অপর জন পড়ল না। তারপর তারা আল্লাহর রসূল (ﷺ) এর নিকট এলে ঘটনা খুলে বলল। তিনি যে নামায ফিরিয়ে পড়েনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমার আমল সুন্নাহর অনুসারী হয়েছে এবং তোমার নামাযও যথেষ্ট (শুদ্ধ) হয়ে গেছে।” আর যে ওযু করে নামায ফিরিয়ে পড়েছিল, তার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, “তোমার জন্য ডবল সওয়াব।” (আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান, মিশকাত ৫৩৩নং)
প্রকাশ যে, সুন্নাহ্ জানার পর ডবল করে নামায বৈধ নয়। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্হ, ইবনে উষাইমীন ১/৩৪৪)
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নামায পড়া অবস্থায় পানি পেয়ে যায়, তাকে নামায ছেড়ে দিয়ে ওযু করে পুনরায় নামায পড়তে হবে। (ফিকহুস সুন্নাহ্ উর্দু ১/৬৩, আলমুমতে’, শারহে ফিক্হ, ইবনে উষাইমীন ১/৩৪৩)
ওযু ও গোসলের পর যে কাজ করা বৈধ, তায়াম্মুমের পরও সেই কাজ করা বৈধ হয়। যেহেতু তায়াম্মুম ওযু-গোসলের পরিবর্ত। (ঐ)
পানি বা মাটি কিছু না পাওয়া গেলে বিনা ওযু ও তায়াম্মুমেই নামায পড়তে হবে। (বুখারী ৩৩৬নং)
ঘরে থাকলেও খোঁজাখুঁজির পর পানি না পাওয়া গেলে এবং নামাযের সময় অতিবাহিত হওয়ার আশঙ্কা হলে তায়াম্মুম করে নামায পড়তে হবে। (বুখারী, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ১/৫২৫-৫২৬)
পক্ষান্তরে পানি মজুদ থাকলে নামাযের ওয়াক্ত চলে যাওয়ার আশঙ্কা হলেও ওযু-গোসল করে নামায পড়তে হবে। ঐ সময় তায়াম্মুম করে নামায হবে না। (ঐ ১/২১২)
একই তায়াম্মুমে কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়া সিদ্ধ। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্হ, ইবনে উষাইমীন ১/৩৪০) সিদ্ধ না হওয়ার ব্যাপারে আসার গুলো শুদ্ধ নয়।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন