অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা!
মানুষ দুনিয়ার সামান্য স্বার্থে,
দ্বীন বিক্রি করে দিবে!
রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
"অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের দিকে অগ্রসর হও।
সে সময় সকালে একজন মু’মিন হলে বিকালে কাফির হয়ে যাবে; আর বিকেলে মু’মিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে।
মানুষ দুনিয়ার সামান্য সম্পদের বিনিময়ে নিজের দ্বীনকে বিক্রি করে দেবে।"
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ২১৩
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে ফিতনার ভয়াবহতা এবং দ্রুত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ফিতনা এত দ্রুত মানুষকে গ্রাস করবে যে, মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের স্থিরতা থাকবে না। মানুষ খুব সামান্য কারণে বা জাগতিক মোহে নিজের ঈমানি অবস্থান পরিবর্তন করবে।
📚শরহুল মুসলিম, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৩৩।
আল্লামা ইবনে বায (রহ.) ও শায়খ উসাইমীন (রহ.)-এর মতে, এই হাদিসে 'কাফির হয়ে যাওয়া' বলতে আক্ষরিক অর্থেই ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়াকেও বোঝানো হয়েছে।
এর মূল কারণ হবে "দুনিয়ার মোহ"। মানুষ পদ-পদবি, ক্ষমতা বা অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে অন্যায়ের সাথে আপস করবে, যা তাকে কুফরির দিকে নিয়ে যাবে।
📚ফাতাওয়া ইবনে বায, খণ্ড-২৬, পৃষ্ঠা-২৭২; শরহু রিয়াদুস সলেহীন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)- তিনি মনে করেন, এই ফিতনাগুলো মূলত 'দ্বিধা-দ্বন্দ্বের'। মানুষের সামনে সত্য-মিথ্যা এত বেশি মিশে যাবে যে, মানুষ সকালে যেটিকে হক (সত্য) মনে করবে, বিকালের মধ্যেই কোনো প্ররোচনায় পড়ে সেটিকে বাতিল মনে করতে শুরু করবে।
ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-মুফহিম'-এ উল্লেখ করেছেন যে, এই হাদিসে 'সকালে মু’মিন বিকেলে কাফির' হওয়ার মানে হলো— ফিতনার সময় মানুষের নৈতিকতা ও আদর্শের কোনো স্থিরতা থাকবে না। মানুষ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে খুব দ্রুত সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে গ্রহণ করবে। বিশেষ করে যখন রক্তপাত ও সম্পদের ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে, তখন মানুষ নিজের জীবন বা জীবিকার ভয়ে হকের পথ ছেড়ে দিবে।
📚আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩২৯।
বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) ফিতনা সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন, "ফিতনা আসার আগে আমল করা" মানে হলো— যখন মানুষ দুনিয়াবি কাজে মগ্ন হয়ে ঈমান ও আমল ভুলে যাবে, তখন একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হবে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা। কারণ ইবাদত ফিতনার সময় অন্তরকে শান্ত ও স্থির রাখে।
📚ফাতহুল বারী, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৭৩ (ফিতনা অধ্যায়)।
মোল্লা আলী কারী (রহ.) তিনি তাঁর 'মিরকাতুল মাফাতিহ' গ্রন্থে বলেন,
"দুনিয়ার সামান্য সম্পদ" বলতে শুধু টাকা-পয়সা নয়, বরং ক্ষমতা, কুখ্যাতি বা মানুষের প্রশংসা পাওয়াকেও বোঝানো হয়েছে। মানুষ মানুষের কাছে ভালো সাজার জন্য বা জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করবে, যা তাকে কুফরির দিকে ঠেলে দিবে।
📚মিরকাতুল মাফাতিহ শরহুল মিশকাত, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-১৮।
ওলামায়ে কেরাম এই হাদিসটিকে দুই ধরণের ফিতনার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন,
শুভহাত (সন্দেহ) দ্বীনি বিষয়ে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হওয়া।
শাহওয়াত (লালসা) ভোগবিলাস এবং জাগতিক লোভের কারণে দ্বীন ত্যাগ করা।
এই হাদিস থেকে আমাদের জন্য
জরুরী মেসেজ...
১. দ্রুত নেক আমল করা...
ফিতনা আসার অপেক্ষা না করে এখনই ইবাদত ও দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।
২. দুনিয়ার লোভ ত্যাগ করা...
যে কোনো স্বার্থে নিজের আদর্শ বা ঈমান বিসর্জন না দেওয়া।
৩. স্থিরতা বজায় রাখা...
কুরআন ও সুন্নাহর ওপর অটল থাকা।
৪. বেশী বেশী দোয়া করা...
রাসূলুল্লাহ (ছা.) শিখিয়েছেন—
"ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দীনিক" (হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন)।
পরিশেষে...
হাদিসের এই সতর্কবার্তা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং সচেতন করার জন্য। চারপাশের চাকচিক্য আর সাময়িক লাভের মোহ যেন আমাদের চিরস্থায়ী আখিরাতকে ধ্বংস করে না দেয়, সেই লক্ষ্যেই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত সুচিন্তিত।
মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার এই সফর খুবই সংক্ষিপ্ত; আজ আছে তো কাল নেই। তাই আসুন, স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর মজবুত রশি আঁকড়ে ধরি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ফিতনার এই অন্ধকার থেকে রক্ষা করুন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু নসিব করুন। আমীন।
আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যূমু ওয়াতুবু ইলাইহি।
🖋️ সাগর হারুন রশিদ সালাফী
বিদ'আতের অন্ধকারে সুন্নাহর মশাল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন