সালাতে তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্যান্য স্থানে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন না করা সংক্রান্ত হাদিসগুলো কি সহিহ?
সালাতে তাকবিরে তাহরিমার সময় দু হাত কাঁধ বা কানের লতি বরাবর উত্তোলন করতে হবে। এ বিষয়ে কোনও কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু রুকুতে যাওয়া, রুকু থেক মাথা উঠানো এবং ১ম বৈঠকের পর ৩য় রাকাতে ওঠার সময় হাত ওঠানোর বিষয়টি বহু সংখ্যক সাহাবি, তাবেয়ি এবং ৪ মাজহাবের ইমামদের মধ্যে একমাত্র ইমাম আবু হানিফা রাহ. ছাড়া সকল ইমাম নিজেরা আমলের পাশাপাশি এর পক্ষে ফতওয়া প্রদান করেছেন।
তবে যারা হাত না তোলার পক্ষে মত দিয়েছেন, তারা যে সব হাদিস পেশ করেছেন, হাদিসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং নিরপেক্ষতার স্বার্থে সেগুলোর বিশুদ্ধতা যাচায় করা জরুরি।
তাই এ বিদগ্ধ হাদিস বিশারদগণের মতামতের আলোকে নিম্নে এ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হল:
✪ রফউল ইয়াদাইন বা হাত না তোলার পক্ষে যে হাদিসটি দলিল হিসেবে সব চেয়ে বেশি উপস্থাপন করা হয় তা হল:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رضي الله عنه قَالَ: أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَصَلَّى، فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ.
"আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কি তোমাদের রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামাজের মতো নামাজ পড়িয়ে দেখাব না? এরপর তিনি নামাজ পড়লেন এবং প্রথমবার (তাকবিরে তাহরিমা) ছাড়া আর হাত তুললেন না।"
❑ এই বর্ণনার ব্যাপারে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এই হাদিসটি বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ হাফেজে হাদিস ও বিজ্ঞ ফকিহগণ এ গুলোকে সনদগতভাবে দুর্বল বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এখানে সেগুলো তুলে ধরা হলো। (সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে এখানে সনদগত চুলচেরা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়নি।)
➧ নিচে মুহাদ্দিসগণের কয়েকটি মতামত:
• ১. ইমাম ইবনুল মুবারক রাহ. এ হাদিসটি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন, "لم يثبت" অর্থাৎ এটি (রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত নয়। [সুনান তিরমিজি: ২৫৬] ও [আল খিলাফিয়্যাত: ১৬৯৯]।
• ২. ইমাম নওয়াবি রাহ. বলেন: "ضعيف، اتفقوا على تضعيفه" অর্থাৎ হাদিসটি দুর্বল এবং এটি দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ একমত।” [খুলাসাতুল আহকাম: ১/৩৫৪]।
• ৩. ইমাম আবু দাউদ এ হাদিসটি তাঁর সুনানে বর্ণনা করার পর মন্তব্য করেছেন, "ليس بصحيح على هذا اللفظ" অর্থাৎ এই শব্দে বা বর্ণনায় হাদিসটি সহিহ নয়। [সুনান আবু দাউদ: ৭৪৮]।
• ৪. ইবনে ক্বুদামাহ হাদিসটিকে "ضعيف" বা দুর্বল বলেছেন। [আল মুগনী: ২/১৭২]।
• ৫. ইবনুল কায়্যিম আরও কঠোরভাবে একে "باطل" বা ভিত্তিহীন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। [আল মানার আল মুনিফ: ১০৪]।
• ৬. মুহাদ্দিস ইবনুল মুলক্কিন একে "ضعيف" বা দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। [আল বদরুল মুনির: ৩/৪৮১]।
➧ আরও কিছু বর্ণনা:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আরেকটি বর্ণনা:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ أَنَّهُ قَالَ: أَلَا أُرِيكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قُلْنَا: نَعَمْ، فَقَامَ فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ تَكْبِيرَةٍ، ثُمَّ لَمْ يَعُدْ.
"তিনি বললেন: আমি কি তোমাদের রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামাজ দেখাব না? আমরা বললাম: হ্যাঁ। তখন তিনি নামাজে দাঁড়ালেন এবং প্রথম তাকবির ছাড়া আর হাত তুললেন না এবং পুনরায় তা আর করলেন না।" [আল খিলাফিয়্যাত লিল বায়হাকি [১৬৯৮]।
ইমাম ইবনুল মুবারক একে "لم يثبت" (অপ্রমাণিত) বলেছেন।
৩. ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনা:
أنَّهُ عليهِ السَّلامُ لا يرفَعُ يدَيهِ إلَّا في أوَّلِ مرَّةٍ
"রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথমবার ছাড়া হাত তুলতেন না।”
মুহাদ্দিস মুবারক পুরী একে "باطل موضوع" (ভিত্তিহীন ও বানোয়াট) বলেছেন।" [তুহফাতুল আহওয়াযী ১/৫৫৬]
✪ ইমাম শাফেয়ি (রাহ.) বলেছেন:
وَلَا يَثْبُتُ عَنْ عَلِيٍّ وَابْنِ مَسْعُودٍ، يَعْنِي: مَا رُوِيَ عَنْهُمَا أَنَّهُمَا كَانَا لَا يَرْفَعَانِ أَيْدِيَهُمَا مِنْ غَيْرِ تَكْبِيرَةِ الْإِحْرَامِ. بَلْ قَالَ الْإِمَامُ الْبُخَارِيُّ رَحِمَهُ اللّٰهُ: لَمْ يَثْبُتْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللّٰهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ لَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ."
“আলি এবং ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে (রফউল ইয়াদাইন না করার বিষয়টি) প্রমাণিত নয়। অর্থাৎ তাঁদের দু জন থেকে যা বর্ণনা করা হয় যে, তাঁরা তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া আর হাত তুলতেন না—তা সাব্যস্ত নয়।
✪ ইমাম বুখারি (রহ.) আরও জোরালো ভাবে বলেছেন:
لَمْ يَثْبُتْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللّٰهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ لَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের মধ্যে একজনের থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি (সালাতের ভেতরে অন্যান্য স্থানে) হাত তুলতেন না।"
পরিশেষে বলব, সালাতে রফউল ইয়াদাইন করা একটি সুন্নত সম্মত আমল যা বহু বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা সু প্রমাণিত এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি এবং অধিকাংশ ইমামদের আমল ও ফতোয়া দ্বারা সমর্থিত। বিপরীতে যারা এটি না করার পক্ষে মত দেন তাঁদের উপস্থাপিত দলিলগুলো মুহাদ্দিসগণের নিকট সনদগতভাবে বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়।
সর্বোপরি মনে রাখতে হবে যে, যেহেতু ইসলামি ফিকাহের ইতিহাসে রফউল ইয়াদাইন বিষয়ে মতভেদটি অত্যন্ত প্রাচীন। আলেমগণ দলিলের আলোকে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাই এইসব শাখাগত ইখতিলাফি বা মতভেদ পূর্ণ মাসয়ালা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা এবং দলিল ভিত্তিক পর্যালোচনা করা কর্তব্য। এ নিয়ে মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হওয়া কোনও ভাবেই কাম্য নয়।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন