ইমাম ও খতিব সাহেবদের "ভাই" বলা — একটি অনুচিত সম্বোধন

 

## ইমাম ও খতিব সাহেবদের "ভাই" বলা — একটি অনুচিত সম্বোধন
আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। মসজিদের ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছেন, দরস দিচ্ছেন, ফতওয়া দিচ্ছেন — আর মুসল্লিরা তাঁকে ডাকছেন "ভাই" বলে। বিষয়টি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও দ্বীনি সমস্যা লুকিয়ে আছে।
আলেমের মর্যাদা কুরআনের দৃষ্টিতে
আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতিরে ইরশাদ করেছেন —
> **إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ**
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে যথাযথভাবে ভয় করেন।"
এই আয়াত আলেমদের একটি বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। যাঁরা আল্লাহর ভয়ে সবচেয়ে এগিয়ে, তাঁদের সাথে সাধারণ মানুষের মতো "ভাই ভাই" সম্পর্কের ভাষায় কথা বলা এই মর্যাদার অবমাননা।
সুরা মুজাদালায় আল্লাহ বলেছেন —
> **يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ**
"যারা ইমান এনেছে এবং যাদের ইলম দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করেন।"
আল্লাহ নিজে যাঁদের মর্যাদা উঁচু করেছেন, আমরা সম্বোধনের মাধ্যমে সেই মর্যাদা নামিয়ে আনব — এটি কি সঙ্গত?
#হাদিসের শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন —
> **لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا**
"যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ)
ইমাম ও খতিব সাহেব শুধু বয়সে বড় নন — ইলম, দ্বীনি দায়িত্ব ও আধ্যাত্মিক মর্যাদায়ও তিনি সমাজের উঁচু স্তরে। তাঁকে "ভাই" বলা এই হাদিসের শিক্ষার পরিপন্থী।
#সালাফের আদর্শ
সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এমন আদবের সাথে বসতেন যেন মাথায় পাখি বসে আছে — নড়াচড়া করতেও ভয় পেতেন। তাবেঈরা আলেমদের সামনে এতটাই বিনম্র থাকতেন যে ইমাম মালিক রহ.-এর দরসে উচ্চস্বরে কথা বলা অসম্ভব ছিল।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন — উস্তাদের সামনে পা ছড়িয়ে বসা তাঁর পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি।
এই ছিল আদবের সংস্কৃতি। আর আজ আমরা সেই আসনে বসা মানুষটিকে "ভাই" বলে ডাকছি।
#ভাই" বলার সমস্যা কোথায়?
প্রথমত, এটি শ্রেণিবিন্যাস মুছে দেয়। সমাজে শিক্ষক ও ছাত্র, আলেম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক স্তরভেদ আছে। "ভাই" বলা এই স্তরভেদকে অস্বীকার করে।
দ্বিতীয়ত, এটি ইমামের কথার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। যাকে "ভাই" মনে করি, তার ফতওয়া বা নসিহত কতটা মনে গেঁথে থাকে? কিন্তু যাকে সম্মানের আসনে রাখি, তাঁর একটি কথাও হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে।
তৃতীয়ত, এটি পশ্চিমা সাম্যবাদী মানসিকতার অনুকরণ। পশ্চিমে সবাই সমান — শিক্ষককেও নামে ডাকো, বড়কেও "বন্ধু" বলো। এই মানসিকতা আমাদের দ্বীনি সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক।
#সঠিক সম্বোধন কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইমাম ও খতিব সাহেবকে সম্বোধন করতে হবে —
"হুজুর",  "শায়খ", "ইমাম সাহেব" খতিব মহোদয় ,ওস্তাদ — মুহতারাম । ইত্যাদি এই শব্দগুলো আদব ও সম্মানের ভাষা। এগুলো শুধু শব্দ নয়, একটি সভ্যতার প্রতিফলন।
আদব হলো ইলমের আগের সিঁড়ি। ইমাম মালিক রহ. বলতেন —
> **تَعَلَّمُوا الأَدَبَ قَبْلَ أَنْ تَتَعَلَّمُوا العِلْمَ**
"ইলম শেখার আগে আদব শেখো।"
যে সমাজে আলেমের সম্মান নেই, সে সমাজে ইলমের আলোও ম্লান হয়ে যায়। ইমাম ও খতিব সাহেবকে যথাযথ সম্মানের সাথে সম্বোধন করা শুধু ব্যক্তির প্রতি সৌজন্য নয় — এটি দ্বীনের প্রতি, ইলমের প্রতি এবং আল্লাহর নির্দেশের প্রতি সম্মানের প্রকাশ।
 ইমাম ও আলেমদের সম্মান — কুরআন, হাদিস ও ওলামাদের বক্তব্যের আলোকে
#প্রথম অধ্যায় — কুরআনের দলিল
**দলিল ১**
> **لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا**
"তোমরা রাসুলকে ডাকাকে তোমাদের পরস্পর ডাকার মতো করো না।"
**(সুরা নূর: ৬৩)**
ইমাম কুরতুবি রহ. এই আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন — রাসুলকে সাধারণ মানুষের মতো নাম ধরে ডাকা হারাম। তাঁকে "ইয়া রাসুলাল্লাহ" বা "ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ" বলতে হবে। এই আদব শুধু নবীর জন্য নয়, নবীর ওয়ারিস আলেমদের প্রতিও এই মানসিকতা থাকা উচিত।
**(তাফসিরে কুরতুবি: ১২/৩২১)**
**দলিল ২**
> **يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ**
"হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না।"
**(সুরা হুজুরাত: ২)**
ইমাম ইবন কাসির রহ. বলেন — এই আয়াত থেকে শিক্ষা হলো আলেম ও বুযুর্গদের সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা, তাদের কথার উপর নিজের কথা প্রাধান্য দেওয়া অনুচিত।
**(তাফসিরে ইবন কাসির: ৭/৩৬৪)**
**দলিল ৩**
> **يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ**
"যারা ইমান এনেছে এবং যাদের ইলম দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করেন।"
**(সুরা মুজাদালা: ১১)**
আল্লামা আলুসি রহ. বলেন — এই আয়াতে আলেমদের জন্য বিশেষ দরজার উল্লেখ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদের মর্যাদার স্বীকৃতি। বান্দার উচিত আল্লাহ যাকে যে মর্যাদা দিয়েছেন তাকে সেই মর্যাদায় রাখা।
**(রুহুল মাআনি: ২৮/২১)**
**দলিল ৪**
> **إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ**
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে যথাযথভাবে ভয় করেন।"
**(সুরা ফাতির: ২৮)**
ইমাম ইবন রজব হাম্বলি রহ. বলেন — এই আয়াত প্রমাণ করে আলেমরা আল্লাহর সবচেয়ে কাছের বান্দা। তাদের সম্মান করা আল্লাহর নিদর্শনকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।
**(ফাদলু ইলমিস সালাফ: পৃ. ৪৩)**
# দ্বিতীয় অধ্যায় — হাদিসের দলিল
**হাদিস ১**
> **الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ**
"আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী।"
**(আবু দাউদ: ৩৬৪১, তিরমিযি: ২৬৮২ — সহিহ)**
ইমাম মুনাবি রহ. বলেন — নবীর ওয়ারিস হওয়ার অর্থ হলো নবীর ইলম, দ্বীন ও মর্যাদার ধারক হওয়া। যে ব্যক্তি নবীর ওয়ারিসকে সম্মান করে না, সে নবীর ইলমকেই অসম্মান করে।
**(ফায়যুল কাদির: ৪/৩৮৫)**
**হাদিস ২**
> **لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ**
"যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেমদের হক চেনে না — সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"
**(মুসনাদে আহমাদ: ৭১৫৭, সহিহ লি গায়রিহি)**
ইমাম আহমাদ রহ. এই হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন — আলেমের হক চেনা মানে তার ইলমের কারণে তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া, তার সামনে বিনম্র থাকা এবং তার সাথে সাধারণ মানুষের মতো আচরণ না করা।
**হাদিস ৩**
> **إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ**
"আল্লাহকে সম্মান করার অংশ হলো বৃদ্ধ মুসলিমকে, কুরআনের ধারককে এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা।"
**(আবু দাউদ: ৪৮৪৩ — হাসান)**
ইমাম খাত্তাবি রহ. বলেন — "হামিলুল কুরআন" অর্থ শুধু হাফেয নয়, বরং যিনি কুরআনের ইলম ও আমল বহন করেন অর্থাৎ আলেম। তাঁকে সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার অংশ।
**(মাআলিমুস সুনান: ৪/১১৫)**
**হাদিস ৪**
> **أَكْرِمُوا الْعُلَمَاءَ فَإِنَّهُمْ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ، فَمَنْ أَكْرَمَهُمْ فَقَدْ أَكْرَمَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ**
"আলেমদের সম্মান করো। কারণ তারা নবীদের উত্তরাধিকারী। যে তাদের সম্মান করল, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সম্মান করল।"
**(কানযুল উম্মাল: ২৮৬৮৭)**
## তৃতীয় অধ্যায় — ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য
**ইমাম শাফেয়ি রহ. (মৃ. ২০৪ হি.)**
> **مَنْ أَهَانَ العُلَمَاءَ فَقَدْ أَهَانَ الشَّرِيعَةَ، وَمَنْ أَهَانَ الشَّرِيعَةَ فَقَدْ أَهَانَ اللهَ**
"যে আলেমদের অপমান করল সে শরিয়তকে অপমান করল। আর যে শরিয়তকে অপমান করল সে আল্লাহকেই অপমান করল।"
**(মানাকিবুশ শাফেয়ি, বায়হাকি: ২/১৫৪)**
**ইমাম মালিক রহ. (মৃ. ১৭৯ হি.)**
তাঁর দরসে কেউ উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি বলতেন —
> **هَذَا مَجْلِسُ العِلْمِ، لَا يُرْفَعُ فِيهِ الصَّوْتُ**
"এটি ইলমের মজলিস, এখানে কণ্ঠ উঁচু করা যায় না।"
**(তারতিবুল মাদারিক: ১/১৩৮)**
**ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রহ. (মৃ. ২৪১ হি.)**
তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বলেন — আমি কখনো বাবার সামনে পা ছড়িয়ে বসিনি, কোনো প্রশ্ন করার আগে অনুমতি নিতাম। তিনি ছিলেন আমার পিতা — তবুও আলেম হিসেবে তাঁর আদব আলাদাভাবে রক্ষা করতাম।
**(মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, ইবন জাওযি: পৃ. ৩২১)**
**ইমাম নববি রহ. (মৃ. ৬৭৬ হি.)**
> **يَنْبَغِي لِلْمُتَعَلِّمِ أَنْ يَتَوَاضَعَ لِشَيْخِهِ وَيُعَظِّمَهُ، وَأَنْ يَعْلَمَ أَنَّ تَعْظِيمَهُ تَعْظِيمٌ لِلْعِلْمِ**
"ছাত্রের উচিত উস্তাদের সামনে বিনম্র থাকা এবং তাঁকে সম্মান করা। জেনে রাখো — উস্তাদকে সম্মান করা ইলমকেই সম্মান করা।"
**(আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব: ১/৩৭)**
**আল্লামা ইবন আবিদিন শামি রহ. (মৃ. ১২৫২ হি.)**
> **تَعْظِيمُ أَهْلِ الْعِلْمِ وَاجِبٌ شَرْعًا، وَإِهَانَتُهُمْ مِنَ الْكَبَائِرِ**
"আলেমদের সম্মান করা শরঈভাবে ওয়াজিব। আর তাদের অপমান করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।"
**(রদ্দুল মুহতার: ১/৪৫)**
**হযরত থানভি রহ. (মৃ. ১৩৬২ হি.)**
 আলেমদের সাথে সাধারণ মানুষের মতো ব্যবহার করা দ্বীনের অবমাননার আলামত। যে জাতি আলেমদের কদর করে না, সে জাতির দ্বীনি অবনতি অনিবার্য।
**(মালফুযাতে থানভি: ৩/২১৭)**
**মুফতি রশিদ আহমাদ লুধিয়ানভি রহ.**
আহসানুল ফাতাওয়ায় তিনি লিখেছেন — আলেমকে তাচ্ছিল্য করা, তাঁর সম্মানহানি করা, তাঁকে সাধারণ মানুষের কাতারে নামিয়ে আনা — এসব কাজ ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ এবং কিছু ক্ষেত্রে কুফরের নিকটবর্তী।
**(আহসানুল ফাতাওয়া: ১/৫৩)**
#চতুর্থ অধ্যায় — সালাফের আমলি নমুনা
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন — আমি ইমাম মালিকের সামনে পাতার শব্দ না হয় এ জন্য অত্যন্ত আস্তে কিতাবের পাতা উল্টাতাম, যাতে তাঁর মনোযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়।
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন — ইমাম আবু হানিফার দিকে পা দিয়ে ঘুমানো আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি, যদিও তাঁর বাড়ি ছিল অনেক দূরে।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. হযরত যায়িদ ইবন সাবিতের উটের লাগাম ধরে হাঁটতেন এবং বলতেন — "এভাবেই আমাদের আলেমদের সম্মান করতে বলা হয়েছে।"
#সারসংক্ষেপ
কুরআন, হাদিস এবং ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য একটিই কথা বলে — আলেম ও ইমামদের সাধারণ মানুষের কাতারে রাখা শরঈ দৃষ্টিতে অনুচিত, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনাহ। "ভাই" বলে সম্বোধন করা শুধু ভাষার সমস্যা নয় — এটি আলেমের মর্যাদা সম্পর্কে ভুল ধারণার প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আলেমদের যথাযথ সম্মান করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন