বিদাআতে হাসানা অথবা বিদাআতে সাইয়্যেয়াহ উভয়ই পরিত্যাজ্য

 


 বিদাআতে হাসানা অথবা বিদাআতে সাইয়্যেয়াহ উভয়ই পরিত্যাজ্য। কারণ সকল বিদাআতই পথভ্রষ্টতা। একটি ভালো বিদাআত উদ্ভাবনের পর একে খারাপ প্রমাণ করার যেমন অনেক যুক্তি পেশ করা যায় তেমনি একটি মন্দ বিদাআতকে সুন্দর ও আবশ্যকীয় প্রমাণ করতে অসংখ্য যুক্তি দাড়ঁ করানো যায়। অথচ বিদাআতের পরিণাম উভয় ক্ষেত্রেই এক। বিদআতির বিদাআত ত্যাগ না করা পর্যন্ত তওবা কবুল হয়না। তার ফরজ, নফল কোন ইবাদত কবুল হয়না। হাউযে কাওসারের পানি তার নসিবে জুটবে না। আর না জুটবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত।
শরিয়তে আপনি যে পরিমাণ নব উদ্ভাবন করবেন আল্লাহ তা'আলা সেই পরিমাণ সুন্নতের অপসারণ করবে। 
নব উদ্ভাবিত সবই কী বিদআত? বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে পোস্টের কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। কয়েকটি ছোট উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আল্লাহ তৌফিক দিন।
*কোরআন কারীমে স্বরচিহ্ন (জের,যবর,নুকতা..) নুতন উদ্ভাবন। অনারবগণ যাতে বিশুদ্ধ ভাবে সুন্নত মোতাবেক কোরআন তেলওয়াত করতে পারে সে জন্য আলী রা. এর নির্দেশে এর প্রচলন করা হয়। অথচ এর আগে স্বরচিহ্ন ছাড়াই মুহাম্মদ সা. ও সাহাবীগণ রা. কোরআন তেলওয়াত করতেন এবং মূল যে পান্ডুলিপিটি আছে সেটিও স্বর চিহ্ন ছাড়াই সংরক্ষিত আছে। এখন এই স্বরচিহ্ন সংযোজন কি বিদাআত? না কারণ এটি সুন্নত মোতাবেক কোরআন তেলওয়াতের সহায়ক মাত্র। স্বরচিহ্ন যুক্ত ও স্বরচিহ্ন ছাড়া উভয় প্রকার কোরআন তেলওয়াতের নেকি একই। কোনটাতে নেকির তারতম্য নেই। সুতরাং কোরআন তেলওয়াতে যে ফযিলত তার কমবেশি হয়নি। তেলওয়াতের সওয়াব উভয় প্রকার পাঠকারীরই সমান এবং নির্ধারিত (প্রতি হরফে ১০ নেকি) কিন্তু স্বরচিহ্ন যুক্ত করার কারণে কোন নেকি নির্ধারিত নেই এবং তা  আশাও করা যায়না। সুন্নত পালনে সহায়তা করায় নেকি পেতে পারেন কিন্তু নব উদ্ভাবনের কোন নেকি নেই। ফকিহগণ এমন নব উদ্ভাবনকে 'সুন্নতে হাসানা' বলেছেন।
* রাসূল সা. এর নির্দেশ আংগুলে তাসবিহ গণনা করা।তিনি বলেছেন কিয়ামতের মাঠে আংগুল সাক্ষী হবে। তারপরও কিছু সাহাবীগণ রা. নুড়ি পাথর, গিট দেয়া সুতা গণনার জন্য ব্যবহার করতেন। রাসূল সা. দেখা সত্ত্বেও নিষেধ করেন নি (সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত)। এখন তসবিহ দানা ব্যবহার কে বিদাআত বললে সাহাবিদের বিদআতি বলতে হবে। দু:খজনক হলেও সত্য বর্তমানের অনেক সালাফি আলেমও একে বিদাআত বলেন।কিন্তু তারা কি জানেন না কাদের ওপর এই অপবাদ তারা দিচ্ছেন? সাধারণ ভাবে দেখা গেলে তসবিহ দানা ব্যবহার করে তসবিহ গণনায় সওয়াব বেশি হবে না আবার ব্যবহার না করলেও একই সওয়াব। অবশ্যই এটি 'সুন্নতে নববী' নয় তবে 'সুন্নতে সাহাবা'। তদ্রূপ উমর রা. এর জামাতে তারাবীর প্রচলন ও উসমান রা. এর জুমার দুই আযান 'সুন্নতে সাহাবা'। এখানে উল্লেখযোগ্য যে উমর রা. নিজেই তার তারাবী জামাআতে আদায়ের প্রচলনকে ভাল বিদাআত বলেছেন। আবার আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রা. ওসমান রা. এর জুমার ডাক আযানকে বিদাআত বলেছেন। এখন কথা হচ্ছে তারা সমমর্যাদার ও মুসলিম উম্মাহর আদর্শ। তারা তাদের কর্মের দোষত্রুটি ধরার অধিকার রাখেন। আমরা তো দূরের কথা তাদের পরবর্তী তাবেঈ, তাবে তাবেঈ গণও তাদের ব্যপারে অসতর্কতা মূলক কথা বলতে পারেন না।কিন্তু দু:খের সংগে বলতে হচ্ছে বর্তমানে অনেক অসতর্ক আলেমই এগুলোকে বিদাআত বলছেন।
*মাইকের ব্যবহার, হজ্জের জন্য বিমান ব্যবহার,পাকা আধুনিক সাজসজ্জা বিশিষ্ট মসজিদ, নকশা খচিত সুন্দর মিম্বর,নব উদ্ভাবিত খাবার(বার্গার,পিৎজা..), মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, নূরানী কায়দা,শিক্ষার জন্য আধুনিক ইলেকট্রনিক উপকরণ ব্যবহার, পোশাক এগুলো কোনটাই ইবাদতের রীতিনীতি পরিবর্তন করেনা বরং ইবাদত পালনে সহায়ক।এগুলোতে যারা বিদাআত খুঁজেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে এই নাদানের হেদায়েত কামনা করা ছাড়া আর কোন কিছু করণীয় নেই।
*এই পয়েন্টে অনেক বিরোধী বক্তব্য বলার লোক থাকবে কিন্তু না বলে থাকতে পারছিনা। মীলাদ,ওরস,নেচে কুদে স্বশব্দে জিকির,কবর পাকা করে মাজার বানানো,চাঁদর চড়ানো,বাতি দেয়া,বিভিন্ন দিবস পালন,নিজের বানানো জিকির(ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আল্লাহু...),দাঁড়িয়ে দুরুদ পাঠ,সুন্নতে খৎনার অনুষ্ঠান ইত্যাদি আরও অনেক কর্ম যা সালাফগণ( সাহাবী থকে তাবে তাবেঈ) করেন নি এবং এর পক্ষে কোন দলিল ও পাওয়া যায়না এগুলোকে কী বলবেন? যারা করেন তারা রাসূলের মহব্বতেই করেন কিন্তু এ কেমন মহব্বত যে মহব্বতে তার কর্মের অনুসরণ হয় না? আপনার এইসব কাজ যদি ক্ষেত্র বিশেষে জায়েজ ও হয় তবুও আপনি কী বলতে পারেন এইসব কাজের জন্য আপনি কোন নেকি পাবেন বা আল্লাহ ও তার রাসূল সা. নির্দিষ্ট কোন নেকির কথা বলে গেছেন? তাহলে এসব অর্থহীন কাজ করে 'খিলাফে সুন্নত' করার মধ্যে আপনি যতই তৃপ্তি পান সওয়াবের আশা বিন্দুমাত্র করতে পারেন না। বরং বিদাআতের (হোক ভাল বিদাআত) পাপে পাপী হওয়ার আশংকা রাখেন। অথচ সুন্নত হিসেবে বিদাআত পালন করার চেয়ে  সুন্নত না পালন করাই উত্তম বলে ফকিহগণ মত দিয়েছেন। কারণ সুন্নত পালন না করলে গুনাহ নেই কিন্তু বিদাআত করলে পাপ নিশ্চিত। আর বিদাআত বর্জন করা ওয়াজিব।
পরিশেষে বলতে পারি সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ ই এই উম্মতের একমাত্র মুক্তির পথ। বিদাআত করলে রাসূল সা. এর নবুয়্যতকেই অপূর্ণ বলে সাব্যস্ত করা হয়। তার কর্মে অপরিপূর্ণতা ও অতৃপ্তি থেকে যায় বলে প্রমাণ করা হয়। তাই আমরা সর্বপরি সুন্নতের মধ্যে নিজেদের নিমজ্জিত করে বিদাআত পরিত্যাগ করেমহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেদের পরিচালিত করি।আল্লাহ তৌফিক দিন।আমীন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন