কুরবানী কার উপর ওয়াজিব


কুরবানী (উযহিয়া) ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পশু জবাই করার মাধ্যমে আদায় করা হয়। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাজ নয়—বরং ত্যাগ, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। কুরবানীর ইতিহাস আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সেই অসাধারণ ত্যাগের ঘটনা, যা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপ্রেরণা।
কুরবানী কার উপর ওয়াজিব—এ প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, একজন মুসলিমের উপর কুরবানী ওয়াজিব হয় তখন, যখন তার কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (নিসাব) থাকে। এই নিসাব হলো সেই পরিমাণ সম্পদ, যা থাকলে যাকাত ফরজ হয় (যদিও কুরবানীর ক্ষেত্রে বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়)। সাধারণভাবে বলতে গেলে, যদি কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য অথবা তার সমপরিমাণ নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য বা অতিরিক্ত সম্পদ থাকে—তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সম্পদটি তার মৌলিক প্রয়োজন (বাসস্থান, ব্যবহারের পোশাক, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস) বাদ দিয়ে অতিরিক্ত হতে হবে। যদি এই অতিরিক্ত সম্পদের মূল্য নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে সে ব্যক্তি কুরবানীর জন্য উপযুক্ত (সাহিবে নিসাব) বলে গণ্য হবে।
অনেকেই প্রশ্ন করেন—স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি উপার্জন করেন, তাহলে কি তাদের উভয়ের উপর আলাদা আলাদা কুরবানী ওয়াজিব হবে? এর উত্তর হলো: হ্যাঁ, যদি স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তাদের প্রত্যেকের উপর পৃথকভাবে কুরবানী ওয়াজিব হবে। কুরবানী একটি ব্যক্তিগত ইবাদত, এটি পরিবারের উপর সমষ্টিগতভাবে ওয়াজিব হয় না। তাই একজনের কুরবানী অন্যজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নয়—যদি না সে অন্যের পক্ষ থেকে আলাদা করে নিয়ত করে কুরবানী আদায় করে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি স্বামীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর একটি কুরবানী ওয়াজিব। একইভাবে, যদি স্ত্রীর নিজের উপার্জন, সঞ্চয় বা স্বর্ণালংকার মিলিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপরও একটি কুরবানী ওয়াজিব হবে। তবে যদি স্ত্রীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়—এক্ষেত্রে স্বামীর কুরবানীই যথেষ্ট।
কুরবানীর সময়সীমাও নির্ধারিত। এটি ঈদুল আজহা-এর দিন (১০ জিলহজ) থেকে শুরু করে ১১ ও ১২ জিলহজ পর্যন্ত (কিছু মতে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত) করা যায়। তবে ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করা সহিহ নয়—প্রথমে নামাজ আদায় করতে হবে, তারপর কুরবানী।
কুরবানীর পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত রয়েছে। পশুটি হতে হবে সুস্থ, নির্দোষ এবং নির্দিষ্ট বয়সের—যেমন ছাগল বা ভেড়া এক বছর, গরু দুই বছর এবং উট পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে। অসুস্থ, অন্ধ, খোঁড়া বা খুব দুর্বল পশু কুরবানীর জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই করা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কুরআনে বলা হয়েছে: “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের মাংস বা রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” তাই কুরবানীর মাধ্যমে আমাদের উচিত নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ এবং স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করা।
সবশেষে বলা যায়, কুরবানী একটি মহান ইবাদত, যা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করে। তাই যারা সামর্থ্যবান, তাদের উচিত এই ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা। আর স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে—যদি দুজনেই নিসাবের মালিক হন, তাহলে তাদের উভয়ের উপরই আলাদা কুরবানী ওয়াজিব হবে। 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন