রাফ’উল ইয়াদাঈন বা হাত উত্তোলন সংক্রান্ত হাদিসসমূহ

রাফ’উল ইয়াদাঈন বা হাত উত্তোলন সংক্রান্ত হাদিসসমূহ

সহীহ বুখারির আধুনিক প্রকাশনীর ৬৯৫ নং হাদীসের বিশাল এক টীকা লেখা হয়েছে বহু মারফু হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করে মাযহাবী রসম রেওয়াজ চালু রাখার জন্য। হানাফী মাযহাবে তাকবীরে তাহরীমাহ ছাড়া কোথাও রাফ’উল ইয়াদাঈন করা হয় না অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজীবন সালাতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়াও রাফ’উল ইয়াদাঈন বা হাত উত্তোলন করেছেন। নিম্নের হাদীস তার জ্বলন্ত প্রমাণঃ

 

৭৩৬، ৭৩৯. আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি তিনি যখন সালাতের জন্য দাঁড়াতেন তখন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। এবং যখন তিনি রূকূর জন্য তাকবীর বলতেন তখনও এরূপ করতেন। এবং যখন রূকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও এরূপ করতেন। ইমাম বুখারী এটা বর্ণনা করেছেন। তাঁর অপর বর্ণনায় এটাও আছে যে, যখন তিনি {রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম} দ্বিতীয় রাক’আত হতে (তৃতীয় রাক’আতের জন্য) দাঁড়াতেন তখনও দু’হাত (কাঁধ বরাবর) উঠাতেন।

[বুখারী ১ম খণ্ড ১০২ পৃষ্ঠা। মুসলিম ১৬৮ পৃষ্ঠা। আবূ দাঊদ ১ম খণ্ড ১০৪,১০৫ পৃষ্ঠা। তিরমিযী ১ম খণ্ড ৫৯ পৃষ্ঠা। নাসাঈ ১৪১, ১৫৮, ১৬২ পৃষ্ঠা। ইবনু খুযায়মাহ ৯৫,৯৬। মেশকাত ৭৫ পৃষ্ঠা। ইবনে মাজাহ ১৬৩ পৃষ্ঠা। যাদুল মাআদ ১ম খণ্ড ১৩৭,১৩৮,১৫০ পৃষ্ঠা। হিদায়া দিরায়াহ ১১৩-১১৫ পৃষ্ঠা। কিমিয়ায়ে সায়াদাত ১ম ১৯০ পৃষ্ঠা। বুখারী আধুনিক প্রকাশনী ১ম হাদীস নং ৬৯২, ৬৯৩, ৬৯৫। বুখারী আযীযুল হক ১ম খণ্ড হাদীস নং ৪৩২-৪৩৪। বুখারী ইসলামীক ফাউন্ডেশন ১ম খণ্ড হাদীস নং ৬৯৭-৭০১ অনুচ্ছেদসহ। মুসলিম ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২য় খণ্ড হাদীস নং ৭৪৫-৭৫০। আবূ দাঊদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১ম হাদীস নং ৮৪২-৮৪৪। তিরমিযী ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২য় খণ্ড হাদীস নং ২৫৫। মেশকাত নূর মোহাম্মদ আযমী ও মাদরাসা পাঠ্য ২য় খণ্ড হাদীস নং ৭৩৮-৭৩৯, ৭৪১,৭৪৫। বুলূগুল মারাম ৮১ পৃষ্ঠা। ইসলামিয়াত বি-এ. হাদীস পর্ব ১২৬-১২৯ পৃষ্ঠা]

 

৭৩৬، ৭৩৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাত শুরু করতেন, যখন রুকু করতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন হস্তদ্বয় উত্তোলন করতেন কিন্তু সিজদার মধ্যে হস্তদ্বয় উত্তোলন করতেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সর্বদাই তাঁর সালাত এরূপ করতেন।              

[বায়হাকী, হেদায়াহ দেরায়াহ ১ম খণ্ড ১১৪ পৃষ্ঠা]

 

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযি.) বলেন, রফউল ইয়াদাঈন হল সালাতের সৌন্দর্য, রুকুতে যাবার সময় ও রুকু হতে উঠার সময় কেউ রফ’উল ইয়াদাঈন না করলে তিনি তাকে ছোট পাথর ছুঁড়ে মারতেন।                                                                                        [নায়লুল আওত্বার ৩/১২, ফাতহুল বারী ২/২৫৭]

হাদীস জগতের শ্রেষ্ঠ ইমাম ইসমাঈল বুখারী জুযউর রফ’ইল ইয়াদাইন নামক একটি স্বতন্ত্র হাদীস গ্রন্থই রচনা করেছেন। যার মধ্যে ১৯৮টি হাদীস বিদ্যমান।                             [ছাপা তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ঢাকা]

 

যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী তার সিফাতু সালাতুন্নাবী গ্রন্থে বুখারী ও মুসলিমের হাদীস “তিনি রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় দু’হাত উঠাতেন উল্লেখ করে টীকায় লিখেছেন এ হস্ত উত্তোলন নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে সাব্যস্ত। কিছু সংখ্যক হানাফী আলিম সহ বেশিরভাগ আলিম হাত উঠানোর পক্ষে মত পোষণ করেন।

 

রফ’উল ইয়াদাইন ও খোলাফাইর রাশিদীন এবং আশরা মুবাশশারীনঃ

ইমাম যায়লা’ঈ হানাফী (রহ.), আল্লামা আব্দুল হাই লাখনাবী হানাফী (রহ.), আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী হানাফী (রহ.) এবং হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) সবাই ইমাম হাকেম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ

ইমাম হাকিম (রহঃ) বলেছেনঃ “রফ’উল ইয়াদাইন ব্যতীত অন্য কোন সুন্নাতের বর্ণনার ক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদীন, আশরা মোবাশশারা (জান্নাতের শুভসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সহাবা) এবং বড় বড় সাহাবীগণ (তাদের দূর দেশে ছড়িয়ে পড়ার পরেও) একত্রিত হয়েছেন বলে আমার জানা নেই।                                                       [নাসবুর রায়াহ ১/৪১৮ পৃষ্ঠা, নাইলুল ফারকাদাইন পৃষ্ঠা ২৬, তালখীছ আলহাবীর ১/৮২]

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোনো একজন সাহাবি থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি সালাতে তাকবিরের সাথে হাত তুলতেন না:


প্রশ্ন: খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে কি এমন কোনো বর্ণনা এসেছে যে, তাঁরা সালাতে তাকবিরের সময় হাত তুলতেন না?
 ❑ প্রথমত:
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে এটি প্রমাণিত যে, তিনি সালাতের চারটি স্থানে তাকবিরের সাথে হাত তুলতেন (রফে ইয়াদাইন করতেন):
১. তাকবিরে তাহরিমার সময়,
২. রুকুতে যাওয়ার সময়,
৩. রুকু থেকে মাথা তোলার সময় এবং 
৪. দুই রাকাত শেষ করে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময়।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ
"রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সালাত শুরু করতেন তখন তাকবির দিতেন ও হাত তুলতেন, যখন রুকু করতেন তখন হাত তুলতেন, যখন ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখন হাত তুলতেন এবং যখন দুই রাকাত শেষ করে (তৃতীয় রাকাতের জন্য) দাঁড়াতেন তখন হাত তুলতেন।"
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭৩৯]
ইমাম বুখারি রহ. বলেন,
علي بن المديني – وكان أعلم أهل زمانه   : "حق على المسلمين أن يرفعوا أيديهم لهذا الحديث" انتهى
'আলি ইবনুল মাদিনি—যিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন—বলেছেন: "এই হাদিসের কারণে মুসলমানদের ওপর কর্তব্য হলো (সালাতে) হাত তোলা।"
সালাতে হাত তোলার এই হাদিসগুলো সাহাবিদের একটি বড় দল বর্ণনা করেছেন, যাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ জন।
তাঁদের মধ্যে সাহাবি আবু হুমাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দশজন সাহাবির উপস্থিতিতে এটি বর্ণনা করেছেন (যাদের মধ্যে আবু কাতাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও ছিলেন)। তাঁরা সবাই এটি সত্যায়ন করেছেন এবং বলেছেন: "রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।" 
এছাড়া সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, ওয়ায়েল ইবনে হুজর, মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস, আনাস, আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সহ আরও অনেকে এটি বর্ণনা করেছেন।
ফলে এই হাদিসটি 'মুতাওয়াতির' (অকাট্যভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাহাবিগণ নিজেরা এটি আমল করতেন এবং যারা আমল করত না তাদের প্রতি আপত্তি জানাতেন। 
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন দেখতেন কেউ হাত তুলছে না তখন তিনি তাকে ছোট পাথর ছুড়ে মারতেন এবং হাত তোলার নির্দেশ দিতেন। [ইমাম বুখারি তাঁর 'রাফউল ইয়াদাইন' গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নববী রহ. একে সহিহ বলেছেন]
হাত না তোলার হাদিস সনদগতভাবে জয়িফ বা দুর্বল:
হানাফি মাজহাব মতে, তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্য কোথাও হাত তোলা সুন্নাত নয়। তারা এর বিপরীতে সাহাবি বারা ইবনে আযেব ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত দুটি হাদিস পেশ করেন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণের মতে, এই দুটি হাদিসের কোনটিই সহিহ নয়। সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনা, শাফেয়ি, আহমাদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ও বুখারি রহ. সহ বড় বড় ইমামগণ বারা ইবনে আযেব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন। একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আহমাদ, বুখারি ও দারা কুতনী রহ. সহ অনেকেই ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন।
 ❑ ২য়ত:
খোলাফায়ে রাশেদিন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)গণের পক্ষ থেকে সালাতে হাত তোলার (রফউল ইয়াদাইন) বিষয়টি বর্ণনার ক্ষেত্রে বলা যায়— ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব এবং আলি ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) উভয়েই নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে হাত তোলার হাদিসসমূহ বর্ণনা করেছেন। 
সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁরা উভয়েই হাত তুলতেন এবং তাঁদের ব্যাপারে এর বিপরীত কিছু ধারণা করা জায়েজ নয়। এই কারণেই উলামায়ে কেরাম তাঁদেরকে ঐসব সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাঁরা সালাতে হাত তুলতেন।
আর আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর ব্যাপারেও এমন বর্ণনা পাওয়া যায় যা এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করে। ইবনুল মুনযির তার 'আল আওসাত' গ্রন্থে (৩/৩০৪) ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস সানআনি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
أَخَذَ أَهْلُ مَكَّةَ رَفْعَ الْيَدَيْنِ فِي الصَّلَاةِ فِي الِافْتِتَاحْ وَالرُّكُوعِ ، وَرَفْعِ الرَّأْسِ مِنَ الرُّكُوعِ عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ ، وَأَخَذَهُ ابْنُ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ ، وَأَخَذَهُ عَطَاءٌ عَنِ ابْنِ الزُّبَيْرِ، وَأَخَذَهُ ابْنُ الزُّبَيْرِ عَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ ، وأخذه أبو بكر الصديق عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
"মক্কাবাসীরা সালাত শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত তোলার পদ্ধতি ইবনে জুরাইজ থেকে গ্রহণ করেছেন। ইবনে জুরাইজ এটি আতা থেকে গ্রহণ করেছেন, আতা এটি ইবনুয যুবাইর থেকে গ্রহণ করেছেন, ইবনুয যুবাইর এটি আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে গ্রহণ করেছেন এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এটি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে গ্রহণ করেছেন।" [আল আওসাত লি ইবনিল মুনযির: ৩/৩০৪]
ইমাম বায়হাকি (২৫৩৫) কয়েকজন সাহাবি থেকে হাত তোলার বিষয়টি বর্ণনা করার পর বলেন:
وروينا عن أبي بكر الصديق ، وعمر بن الخطاب ، وعلي بن أبي طالب ، وجابر بن عبد الله ، وعقبة بن عامر ، وعبد الله بن جابر البياضي رضي الله عنهم
"আমরা আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, উকবাহ ইবনে আমের এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জাবির আল বায়াদী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এটি বর্ণনা করেছি।" [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২৫৩৫]
কিছু মানুষ আবু বকর, উমর এবং আলি ((রাদিয়াল্লাহু আনহু)ম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা সালাতে হাত তুলতেন না। কিন্তু তাঁদের থেকে বর্ণিত এই কথাটি সঠিক নয়। 
ইমাম শাফেয়ি (রাহ.) বলেন:
ولا يثبت عن علي وابن مسعود ، يعني : ما روي عنهما أنهما كانا لا يرفعان أيديهما من غير تكبيرة الإحرام
"আলি এবং ইবনে মাসউদ থেকে তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্য কোথাও হাত না তোলার যে বর্ণনা দেওয়া হয়, তা প্রমাণিত নয়।" [আল মাজমু' শরহুল মুহাযযাব: ৩/৩৬৮]
বরং ইমাম বুখারি  (রাহ.) বলেছেন:
لم يثبت عن أحد من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه لم يرفع يديه
"রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোনো একজন সাহাবি থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি হাত তুলতেন না।" [জুযউ রফইল ইয়াদাইন]
হাসান বসরি  (রাহ.) বলেন:
رأيت أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفعون أيديهم إذا كبروا وإذا ركعوا وإذا رفعوا رؤوسهم
"আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবিদের দেখেছি, তাঁরা যখন তাকবির দিতেন, রুকুতে যেতেন এবং রুকু থেকে মাথা তুলতেন, তখন হাত তুলতেন।"
ইমাম বুখারি বলেন:
فلم يستثن أحدا من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم
"তিনি (হাসান বসরি) রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবিদের মধ্যে কাউকে এর ব্যতিক্রম করেননি।" [জুযউ রফইল ইয়াদাইন]
কয়েকজন ইমাম খোলাফায়ে রাশেদিনের পক্ষ থেকে হাত তোলা বা রফউল ইয়াদাইন সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। ইমাম বায়হাকি এই বিষয়ের আলোচনা সমাপ্ত করেছেন ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক আল ফকিহ এর একটি উক্তি দিয়ে তিনি বলেন:
قد صح رفع اليدين عن النبي صلى الله عليه وسلم ثم عن الخلفاء الراشدين ، ثم عن الصحابة والتابعين
"নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে (এই স্থানগুলোতে) হাত তোলা সহিহভাবে প্রমাণিত, অতঃপর খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে, এরপর সাহাবি ও তাবেয়িগণের থেকেও তা প্রমাণিত।" [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২/৭৭]
[আল আওসাত: ৩/২৯৯ ৩০৮, আল মাজমু': ৩/৩৬৭ ৩৭৬, আল মুগনী: ২/১৭১ ১৭৪]
আল্লাহই ভালো জানেন।
[সোর্স: islamqa, প্রশ্ন নং ২২৪৬৩৫]
-অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি 

 "সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন কখন কিভাবে করতে হয় এবং এ সম্পর্কে ১০টি হাদীস"

➖➖➖➖➖➖➖➖➖


সহীহ বুখারীর সালাত অধ্যায় সহ আরও বহু হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের ৪টি স্থানে রাফউল ইয়াদাইন বা দু হাত তোলার কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সে স্থানগুলো হল:⤵️


১. তাকবীরে তাহরীমার সময়, 

২. রুকুতে যাওয়ার সময়,

৩. রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় এবং

৪. তৃতীয় রাকায়াতে দাঁড়িয়ে বুকে হাত বাঁধার সময় ।


যারা আমল করবে তারা সুন্নাহ বাস্তবায়ন করার কারণে সওয়াবের অধিকারী হবে। কেউ না আমল করলেও তার নামায শুদ্ধ হবে কিন্তু সুন্নাহ বাস্তবায়নের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।


■■উক্ত স্থানগুলোতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন প্রসঙ্গে নিচে ১০টি হাদীস পেশ করা হল⤵️


✔১)আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন স্বলাত শুরু করতেন, তখন উভয় হাত তার কাঁধ বরাবর উঠাতেন । আর যখন রুকুতে যাওয়ার জন্য তাকবীর বলতেন এবং যখন রুকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও একইভাবে দু’হাত উঠাতেন এবং সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ বলতেন । কিন্তু সিজদাহর সময় এমন করতেন না । সহীহুল বুখারী, পর্ব: আযান, ১০/৮৩ অধ্যায়: স্বলাত শুরু করার সময় প্রথম তাকবীরের সাথে সাথে উভয় হাত উঠানো, হাদীস নং-৭৩৫ ।(তাও:পাব:)


✔২)আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে দেখেছি, তিনি যখন স্বলাতের জন্য দাঁড়াতেন তখন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন এবং যখন তিনি রুকুর জন্য তাকবীর বলতেন তখনও এরকম করতেন । আবার যখন রুকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও এরকম করতেন এবং সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ বলতেন । তবে সিজদাহর সময় এরকম করতেন না । সহীহুল বুখারী, পর্ব: আযান, ১০/৮৪ অধ্যায়: তাকবীরে তাহরীমা, রুকুতে যাওয়া এবং রুকু হতে উঠার সময় উভয় হাত উঠানো । 

হাদীস নং-৭৩৬ ।(তাও:পাব:)


✔৩)আবু কিলাবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি মালিক ইবনু হুওয়ায়রিস (রাঃ) কে দেখেছেন, তিনি যখন স্বলাত আদায় করতেন তখন তাকবীর বলতেন এবং তার দুহাত উঠাতেন আর যখন রুকু করার ইচ্ছা করতেন তখনও তার উভয় হাত উঠাতেন, আবার যখন রুকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও তার উভয় হাত উঠাতেন এবং তিনি বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রসূল (সাঃ) এরুপ করেছেন। সহীহুল বুখারী, পর্ব: আযান, ১০/৮৪ অধ্যায়: তাকবীরে তাহরীমা, রুকুতে যাওয়া এবং রুকু হতে উঠার সময় উভয় হাত উঠানো । হাদীস নং-৭৩৭ ।(তাও:পাব:)


✔৪)আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন, আমি নাবী (সাঃ) কে তাকবীর দিয়ে স্বলাত শুরু করতে দেখেছি, তিনি যখন তাকবীর বলতেন তখন তার উভয় হাত উঠাতেন এবং কাঁধ বরাবর করতেন । আর যখন রুকুর তাকবীর বলতেন তখনও এরকম করতেন । আবার যখন সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ বলতেন, তখনও এরকম করতেন এবং রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ বলতেন । কিন্তু সিজদাহয় যেতে এরকম করতেন না । আর সাজদা হতে মাথা উঠাবার সময়ও এমন করতেন না । সহীহুল বুখারী, পর্ব: আযান, ১০/৮৫ অধ্যায়: উভয় হাত কতটুকু উঠাবে । হাদীস নং-৭৩৮ ।(তাও:পাব:)


✔৫)নাফি (রাহঃ) হতে বর্ণিত যে, ইবনু উমার (রাঃ) যখন স্বলাত শুরু করতেন তখন তাকবীর বলতেন এবং দু’হাত উঠাতেন আর যখন রুকু করতেন তখনও দু’হাত উঠাতেন । অতঃপর যখন সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ বলতেন তখনও দু’হাত উঠাতেন এবং দু’রাকাত আদায়ের পর যখন দাঁড়াতেন তখনও দু’হাত উঠাতেন । এ সমস্ত আল্লাহর রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণিত বলে ইবনু উমার (রাঃ) বলেছেন । এ হাদীসটি হাম্মাদ ইবনু সালাম ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে নাবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন । ইবনু তাহমান আইয়্যুব ও মুসা ইবনু উকবাহ (রাঃ) হতে এ হাদীসটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন । সহীহুল বুখারী, পর্ব: আযান, ১০/৮৬ অধ্যায়: দু’রাকাআত আদায় করে দাঁড়াবার সময় দু’হাত উঠানো। হাদীস নং-৭৩৯ ।(তাও:পাব:)


✔৬)সালিম এর পিতা ইবনে উমার (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে দেখেছি, তিনি যখন স্বালাত আরম্ভ করতেন তখন উভয় হাত উঠাতেন। এমনকি তা একেবারে তার উভয় কান বরাবর হয়ে যেত। আর রুকু করার পূর্বে এবং যখন রুকু থেকে উঠতেন (তখনও অনুরুপভাবে হাত উঠাতেন)। কিন্তু উভয় সিজদার মাঝখানে তিনি হাত উঠাতেন না। সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকু এবং রুকু থেকে উঠার পর উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠানো মুস্তাহাব; সিজদা থেকে উঠার পর এরুপ করতে হবে না। হাদীস নং-৭৪৭ ।(ই.ফা.বা)


✔৭)ইবনে উমার (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন স্বালাতের জন্য দাঁড়াতেন তখন উভয় হাত উঠাতেন। এমনকি তা তার উভয় কাঁধ বরাবর হয়ে যেত। তারপর তাকবীর বলতেন। পরে যখন রুকু করার ইরাদা করতেন তখনও অনুরুপ করতেন। আবার রুকু থেকে যখন উঠতেন তখনও অনুরুপ করতেন। কিন্তু সিজদা থেকে তখন মাথা তুলতেন তখন এরুপ করতেন না। সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকু এবং রুকু থেকে উঠার পর উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠানো মুস্তাহাব; সিজদা থেকে উঠার পর এরুপ করতে হবে না। হাদীস নং-৭৪৮ ।(ই.ফা.বা)


✔৮)আবু কিলাবা (রাহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি মালিক ইবনু হুয়াইরিস (রাদ্বিঃ) কে দেখলেন, যখন স্বালাত আদায় করতে দাঁড়ালেন, তখন তাকবীর বলে উভয় হাত উঠালেন। আর যখন রুকু করার ইচ্ছা করলেন তখন উভয় হাত উঠালেন। আর রুকু থেকে যখন মাথা উঠালেন তখন আবার হাত উঠালেন এবং (পরে) বর্ণনা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরুপ করতেন। সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকু এবং রুকু থেকে উঠার পর উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠানো মুস্তাহাব; সিজদা থেকে উঠার পর এরুপ করতে হবে না। হাদীস নং-৭৫০ ।(ই.ফা.বা)


✔৯)মালিক ইবনু হুয়াইরিস (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকবীর (তাকবীরে তাহরীমা) বলে উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। আর যখন রুকু করতেন তখনও কান বরাবর উভয় হাত উঠাতেন। আবার যখন রুকু থেকে মাথা তুলে ‘সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখনও অনুরুপ করতেন। সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকু এবং রুকু থেকে উঠার পর উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠানো মুস্তাহাব; সিজদা থেকে উঠার পর এরুপ করতে হবে না। হাদীস নং-৭৫১ ।(ই.ফা.বা)


✔১০)ওয়াইল ইবনে হুজর (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে দেখেছেন যে, তিনি যখন স্বালাত শুরু করলেন তখন উভয় হাত উঠিয়ে তাকবীর বললেন। রাবী হাম্মাম বলেন, তিনি উভয় হাত কান বরাবর উঠালেন। তারপর কাপড়ে (গায়ের চাদরে) ঢেকে নিলেন। তারপর তার ডানহাত বামহাতের উপর রাখলেন। তারপর রুকু করার সময় তার উভয় হাত কাপড় থেকে বের করলেন। পড়ে উভয় হাত উঠালেন এবং তাকবীর বলে রুকুতে গেলেন। যখন ‘সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বললেন তখন উভয় হাত তুললেন। পরে উভয় হাতের মাঝখানে সিজদা করলেন। সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তাকবীরে তাহরীমার পর বুকের নিচে নাভির উপরে বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখা এবং সিজদায় উভয় হাত মাটিতে কান বরাবর রাখা। 

হাদীস নং-৭৮১ ।(ই.ফা.বা)

আল্লাহু আলাম


------------------------

উত্তর প্রদানে:

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন  আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল, সৌদি আরব

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন