অধিকাংশ কোনো দলিল নয়
দলিল বিহীন আমল কবুল হবে না। রসুলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, “যে ব্যক্তি এম৯ন কোনো আমল করলো যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।“ [মুসলিম ই.ফা. ৪৩৪৪]
একদিন হযরত উমর রাঃ বাজারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বাজারে যখন এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন শুনতে পেলেন সেই ব্যক্তি দো'আ করছে - 'হে-আল্লাহ! আমাকে আপনার অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে গন্য করে নিন, হে-আল্লাহ! আমাকে আপনার অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে গন্য করে নিন।'
হযরত উমর রা. সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন - 'তুমি এই দো'আ কোথা থেকে শিখেছো?' উত্তরে সেই ব্যক্তি বললো- 'আল্লাহর কোরআন থেকে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।' [সূরা আস-সাবা ৩৪:১৩]
উত্তর শুনে হযরত উমর রা. কাঁদতে লাগলেন, এবং নিজেকে উপদেশ দিতে লাগলেন - 'হে উমর! মানুষ তোমার থেকে অধিক জ্ঞানী।' সাথে তিনিও দো'আ করতে লাগলেন- 'হে-আল্লাহ! আমাকেও আপনার অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে গন্য করে নাও।'
সুতরাং অধিকাংশ লোক যদি কোনো কাজ করে তবে সেটা বৈধ হয়ে যায় না।
ü বাপ-দাদার ধর্মের সম্মান রক্ষার জন্য নবীজি [সাঃ] এর প্রিয় চাচা, আবু তালেব কাফির অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করেছেন।
ü বাপ-দাদার ধর্ম টিকিয়ে রাখার জন্য আবু জেহেল, আবু লাহাব কাফের হয়ে মরেছে।
আমাদের সমাজে এখনো বাপ-দাদার অজুহাত দেয়া হয়
আবু তালিবের মৃত্যুর সময় এই আবু জেহেল, আবু লাহাবরাই বলেছিল কালেমা পড়ে বাপ-দাদার মুখে চুনকালি দিও না, এজন্য আবু তালিব ঈমান নিয়ে মরতে পারেনাই। যদিও তিনি নবীজি [সাঃ] এর প্রিয়তম চাচাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
আবু তালেব জানতো কুরআন আল্লাহর বানী, মুহাম্মাদ [সাঃ] আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবী। তবুও বাপ-দাদার মুখে চুনকালি পড়বে ভেবে সত্য মেনে নিতে পারে নাই তাই কাফের হয়ে মরতে হয়েছে।
এখনো কিছু লোক আছে যারা কুরআন সুন্নাহর স্পষ্ট দলিল পাওয়ার পরও ইসলামে বাপ-দাদার দোহাই দেয়। মাইন্ড করবেন না আর কিছুতে বাপদাদার দোহাই দেননা কেন? কুরআন হাদিসের রেফারেন্স দিলেই বলেন বাপের জন্মে এসব শুনেন নাই। শুনবেন কি করে? শুনেছেন তো শুধু কিছু ভ্রান্ত হুজুরদের আজগুবি কিচ্ছা কাহিনী। এখন শুনার সুযোগ হয়েছে শুনে নিন। যাচাই করে দলিল মিলিয়ে নিন। যার কথা কুরআন হাদিস সম্মত তারটা গ্রহন করুন বাকিটা ছুড়ে ফেলে দিন। ইসলামে বাপ-দাদার দোহাই চলে না।
বাপ-দাদার দোহাই দেয়া ওয়ালাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলেন-
📗 আল বাকারাহঃ ২.১৭০
وَ اِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلۡفَیۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَ لَوۡ کَانَ اٰبَآؤُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ شَیۡئًا وَّ لَا یَہۡتَدُوۡنَ
যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঐ জিনিসের অনুসরণ কর যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে, বরং আমরা তারই উপর চলব, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথে চলত না তবুও।
📗 আল মায়িদাহঃ ৫.১০৪
وَ اِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ تَعَالَوۡا اِلٰی مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ وَ اِلَی الرَّسُوۡلِ قَالُوۡا حَسۡبُنَا مَا وَجَدۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَ لَوۡ کَانَ اٰبَآؤُہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ شَیۡئًا وَّ لَا یَہۡتَدُوۡنَ
তাদেরকে যখন বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে ও রসূলের দিকে এসো [তখন] তারা বলে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষকে যা করতে দেখেছি [যে পথ ও পন্থা অবলম্বন করতে দেখেছি] আমাদের জন্য তাই যথেষ্ট। যদিও তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই জানত না এবং সঠিক পথপ্রাপ্ত ছিল না [তবুও কি তারা তাদের পথেই চলবে]?
📗সুরা লুকমানঃ ৩১.২১
وَ اِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَا وَجَدۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَ لَوۡ کَانَ الشَّیۡطٰنُ یَدۡعُوۡہُمۡ اِلٰی عَذَابِ السَّعِیۡرِ
তাদেরকে যখন বলা হয়- আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ কর, তখন তারা বলে- বরং আমরা তারই অনুসরণ করব আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে যে পথ অনুসরণ করতে দেখেছি। শয়ত্বান যদি তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তির দিকে ডাকে, তবুও কি [তারা তারই অনুসরণ করবে]?
বাপ-দাদার হিসাব বাপ-দাদারা দিবেন। আপনার হিসাব আপনাকে দিতে হবে। এটা কিন্তু ১০০% সত্য। এরপরও যারা ওহীর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আসলে প্রকৃতপক্ষে এরাই আবু জেহেল, আবু লাহাবের উত্তরসূরী
কিছু নমুনা দেখুনঃ-
[১] বাপ-দাদারা কি এতদিন ভুল করে এসেছেন?
[২] অধিকাংশ মানুষই কি ভুল করে আসছেন?
[৩] এত বড় বড় আলেম তো এভাবেই বলে আসছেন, আমল করে আসছেন! তারা কি ভুল করে গেছেন?
মূলত এই তিনটি অজুহাতে মানুষ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দাওয়াতকে পরিত্যাগ করে। মনে রাখতে হবে “অধিকাংশ” কোন দলীল নয়; দলীল হল কুরআন ও সহীহ হাদিস। আল্লাহ ভালো করেই জানেন [তিনি পূর্ব পর সবই অবগত] ভবিষ্যতে এমন প্রশ্ন আসবে তাই নিদর্শন রেখে অজুহাত বন্ধ করে দিয়েছেন।
এখন যদি আমরা কোরআনে 'অধিকাংশ ব্যক্তি' বা ‘অধিকাংশ’ লিখে অনুসন্ধান করি তখন পাবো -অধিকাংশের ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে বলেছেন-
ü “অধিকাংশই অজ্ঞ” [সূরা আনআম ৬:১১১]
ü “অধিকাংশই জানে না” [সূরা আরাফ ৭:১৩১]
ü তাদের অধিকাংশই মূর্খ। [আল-আনআম ৬:১১১]
ü তাদের অধিকাংশই বুঝে না। [আল-হুজুরাত ৪৯:৪]
ü তোমাদের অধিকাংশই অবাধ্য। [আল-মায়িদাহ ৫:৫৯]
ü অধিকাংশ ব্যক্তিই তা জানে না। [আল-আরাফ ৭:১৮৭]
ü “অধিকাংশ লোকই অবগত নয়” [সূরা আনআম ৬:৩৭]
ü তাদের অধিকাংশই সত্য জানে না। [আল-আম্বিয়া ২১:২৪]
ü অধিকাংশ ব্যক্তিই বিশ্বাস করে না। [হুদ ১১:১৭]
ü অধিকাংশ ব্যক্তিই কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। [আল-বাকারা ২:২৪৩]
ü “অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে অবগত নয়” [সূরা ইউসুফ ১২:৬৮]
ü অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, তারা শোনে না। [হামিম সাজদাহ ৪১:৫]
ü “অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে’’ [সূরা ইউসুফ ১২:১০৬]
ü “তুমি যতই প্রবল আগ্রহ ভরে চাও না কেন, মানুষদের অধিকাংশই ঈমান আনবে না”
[সূরা ইউসুফ ১২:১০৩]
ü “আমি তোমার নিকট সুস্পষ্ট আয়াত নাজিল করেছি, ফাসিকরা ছাড়া অন্য কেউ তা অস্বীকার করে না; বরং তাদের অধিকাংশই ঈমান রাখে না” [সূরা বাকারাহ ২:৯৯-১০০]
ü “তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরন কর তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে ফেলবে, তারা কেবল আন্দাজ-অনুমানের অনুসরন করে চলে তারা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই করেনা” [সূরা আনআম ৬:১১৬]
ü “তাদের অধিকাংশকেই আমি প্রতিশ্রুতি পালনকারী পাইনি, বরং অধিকাংশকে ফাসিকই পেয়েছি” [সূরা আরাফ ৭:১০২]
ü “আমি তো তোমাদের কাছে সত্য নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই ছিলে সত্য অপছন্দকারী” [সূরা যুখরুফ ৪৩:৭৮]
ü “আমি কি তোমাদের জানাব কাদের নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি চরম মিথ্যুক ও পাপীর নিকট।ওরা কান পেতে থাকে আর তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী’’ [সূরা শু’আরা ২৬:২২১-২২৩]
ü “তারা তাদের পিতৃ-পুরুষদের বিপথগামী পেয়েছিল। অতঃপর তাদেরই পদাংক অনুসরন করে ছুটে চলেছিল। এদের আগের লোকদের অধিকাংশই গোমরাহ হয়ে গিয়েছিল” [সূরা সাফফাত ৩৭:৬৯-৭১]
তারপর আমরা যদি 'অল্পসংখ্যক' লিখে অনুসন্ধান করি তখন পাবো আল্লাহ বলেছেন-
ü অল্পসংখ্যকই তাঁর সাথে ঈমান এনেছিলো। [সূরা হুদ ১১:৪০]
ü আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ। [সূরা আস-সাবা ৩৪:১৩]
ü একদল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে। এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য থেকে।
[সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:১৩-১৪]
📗 আল বাকারাহঃ ২.১৪৫
وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ ۙ إِنَّكَ إِذًا لَمِنَ الظَّالِمِينَ……
…..ওয়া মা বা‘দুহুম বিতাবিইন কিবলাতা বা‘দ। ওয়া লা’ইনিত্তাবা‘তা আহওয়াআহুম মিন বা‘দি মা জা’আকা মিনাল ‘ইলমি ইন্নাকা ইযাল্-লামিনায্-যালিমীন।
বাংলা অর্থ: “…. আর আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও যদি আপনি তাদের [প্রবৃত্তির] অনুসরণ করেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি তখন যালিমদের [অবাধ্যদের] অন্তর্ভুক্ত হবেন।”
📗 আল ফাতিরঃ ৩৫.৩৭
وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ ۚ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ ۖ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِن نَّصِيرٍ
ওয়া হুম ইয়াস্তারিখূনা ফীহা, রাব্বানা আখরিজনা না‘মাল সালিহান গাইরাল্লাযী কুন্না না‘মাল। আওয়ালাম নু‘আম্মিরকুম মা ইয়াতাযাক্কারু ফীহি মান তাযাক্কার, ওয়া জা’আকুমুন নাযীর। ফাযূকূ, ফামা লিজ্যালিমীনা মিন নাসীর।
বাংলা অর্থ: আর তারা সেখানে চিৎকার করে বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের বের করে দাও, আমরা পূর্বে যা করতাম তার পরিবর্তে সৎকর্ম করব।’ [আল্লাহ বলবেন] ‘আমি কি তোমাদের এমন বয়স দিইনি যাতে উপদেশ গ্রহণকারী উপদেশ গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং তোমরা স্বাদ গ্রহণ কর; আর যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।”
📗 আন-আম: ৬.১১৬
"যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।"
আসুন আমরা অধিকাংশের, বাপ-দাদার, পুর্ব পুরুষদের অজুহাত বাদ দিয়ে “কুরআন” ও “সহীহ সুন্নাহর অনুসরন করি। আর সেটাই সকলের জন্য উত্তম ও কল্যানকর।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন