যাদের দু'আ কবুল হয় না
যাদের দুআ কবুল হয় না—এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বেশ কিছু কারণ ও শ্রেণির উল্লেখ রয়েছে। নিচে হাদিসের রেফারেন্সসহ বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
◈ ১. হারাম সম্পদ ভক্ষণকারী এবং হারাম পোশাক পরিধানকারীর দু'আ কবুল হয় না:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। “আল্লাহ মুমিনদের প্রতি ঐ একই নির্দেশ দিয়েছেন যা তিনি রসুলদের দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, “হে রসুলগণ, পবিত্র জিনিসগুলো খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আমি ভালো করেই জানি।” [ সূরা মুমিনুন: ৫১]
তিনি আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ, আমি তোমাদের যা রিজিক দিয়েছি, তার পবিত্র অংশ খাও।” [সূরা বাকারা: ১৭২]
এরপর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে, তার চুল এলোমেলো এবং শরীর ধুলায় ধূসরিত। সে আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লাহকে ডাকে: ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার পেট হারাম খাবার দ্বারা পূর্ণ। তাহলে কিভাবে তার দুআ কবুল হতে পারে?” [মুসলিম ১০১৫]
◈ ২. যে ব্যক্তি দু'আ কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করে:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের দুআ কবুল করা হবে, যতক্ষণ না কেউ তাড়াহুড়া করে বলে ফেলে: ‘আমি দুআ করলাম, কিন্তু তা কবুল হলো না।” [বুখারী: ৬৩৪০; মুসলিম: ২৭৩৫]
সুতরাং দুআ কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। বরং ধৈর্যের সাথে রবের দরবারে বারবার আকুতি-মিনতি সহকারে চাইতে হবে। দুআ কবুল হয় না এমন হতাশা থেকে দুআ বাদ দেওয়া যাবে না।
◈ ৩. উদাসীনতা ও অবহেলার সাথে দু'আ করলে তা কবুল করা হয় না:
আবু হুরাইরা [রা.] থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর কাছে দুআ করো, আর দুআ করার সময় তোমরা নিশ্চিত থাকো যে, তা কবুল হবে। এবং জেনে রাখো, আল্লাহ এমন দুআ কবুল করেন না, যা উদাসীন এবং অমনোযোগী হৃদয় থেকে আসে।” [তিরমিজি-ইমাম আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন]
ব্যাখ্যা:
❂ মুমিনের বিশ্বাস: দুআ করার সময় পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ দুআ কবুল করবেন।
❂ দুআ করতে হবে আন্তরিকভাবে, এমন অবস্থায় যাতে অন্তর সচেতন ও উপস্থিত থাকে।
❂ উদাসীন হৃদয়ের দুআ প্রত্যাখ্যান: যে ব্যক্তি দুআ করে অথচ তার মনোযোগ আল্লাহর প্রতি থাকে না বা দুআর গুরুত্ব উপলব্ধি করে না, তার দুআ আল্লাহ কবুল করেন না।
❂ দুআর শর্তাবলী ও পরিবেশ: তুহফাতুল আহওয়াযি-তে বলা হয়েছে: "দুআ করার সময় এমন অবস্থায় থাকতে হবে যাতে তা কবুল হওয়ার উপযুক্ত হয়। অর্থাৎ ভালো কাজ করা, মন্দ কাজ এড়িয়ে চলা, দুআর শর্তগুলো পূরণ করা, হৃদয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বরকতময় সময় ও স্থানের সুযোগ গ্রহণ করা, যেমন সেজদার মুহূর্ত।"
❂ দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর উদারতা: দুআ করার সময় দৃঢ়তার সাথে চাইতে হবে এবং আল্লাহর প্রতি বড় আশা রাখতে হবে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তবে দুআ দৃঢ়তার সাথে করো এবং চাওয়ার মধ্যে বড় আশা রাখো। কারণ, আল্লাহর কাছে এমন কিছু নেই যা তিনি দিতে অক্ষম।” [মুসলিম: ৬৯৮৮]
এখান থেকে যে সব শিক্ষা পাই সেগুলো হলো—
◆ ক. দুআ করার সময় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।
◆ খ. মনোযোগ ও আন্তরিকতা ছাড়া দুআ কবুল হয় না।
◆ গ. দুআর শর্তগুলো পূরণ করা আবশ্যক।
◆ ঘ. আল্লাহর কাছ থেকে বড় কিছু চাইতেও দ্বিধা করা উচিত নয়।
◈ ৪. নিষিদ্ধ জিনিস বা পাপের জন্য দু'আ করলে দুআ প্রত্যাখ্যাত হয়:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোনও বান্দা আল্লাহর কাছে দুআ করলে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের একটিই দান করেন: হয় তার দুআ কবুল করেন, না হয় তা আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন, অথবা তার থেকে কোনও বিপদ দূর করেন। তবে শর্ত হলো, সে পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ না করবে।” [তিরমিজি: ৩৫৭৩]
◈ ৫. সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দান ত্যাগ করা দু'আ কবুল না হওয়ার অন্যতম কারণ:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অন্যথায়, আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা আল্লাহকে ডাকবে, কিন্তু তোমাদের দুআ কবুল করা হবে না।"[তিরমিজি, হা/২১৬৯]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, দুআ কবুল না হওয়ার একটি কারণ হলো, মানুষ যদি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা বন্ধ করে দেয়। যখন মানুষ অন্যায়কে সহ্য করে এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করে না, তখন আল্লাহ তাদের ওপর শাস্তি নাজিল করেন এবং তাদের দুআ কবুল হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
◈ ৬. দু'আকে শর্তযুক্ত করা:
দুআ করার সময় দুআতে শর্তারোপ করা [যেমন: "হে আল্লাহ, যদি আপনি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করুন"] এটি নিষিদ্ধ। বরং আল্লাহর কাছে দৃঢ়তার সাথে চাওয়া এবং আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে দুআ করা আবশ্যক।
"তোমাদের কেউ যেন না বলে: 'হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, আমাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, আমার প্রতি রহম করুন।' বরং দুআতে দৃঢ়ভাবে চাওয়া উচিত, কারণ আল্লাহকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।" [বুখারী: ৬৩৩৯; মুসলিম: ২৬৭]
❂ এই হাদিস থেকে শিক্ষা:
ক. দুআতে দৃঢ়তা: দুআ করার সময় আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপারে পূর্ণ বিশ্বাস রাখা উচিত। শর্তযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা দরকার।
খ. আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি আস্থা: আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং কারো দ্বারা প্রভাবিত হন না। তিনি তাঁর বান্দার দুআ কবুল করেন যখন বান্দা আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে তাঁর কাছে প্রার্থনা করে।
গ. আন্তরিক প্রচেষ্টা: দুআ করার সময় একাগ্রতা এবং অবিরাম অনুরোধ করতে হবে।
মোটকথা, দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়া ইবাদতের অংশ। এটি দৃঢ়তার সঙ্গে এবং আন্তরিকভাবে করতে হবে, যেন আমরা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারি। আল্লাহ আমাদের দুআ কবুল করুন। আমিন।
◈ ৭. দু'আ কবুলের শর্তাবলী অনুপস্থিত থাকা:
যাদের মধ্যে দুআ কবুলের শর্তাবলী অনুপস্থিত থাকবে তাদের দুআ কবুল হবে না। দুআ কবুলের শর্তাবলী হল, ইখলাস তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুআ করা, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতি অনুসারে দুআ করা এবং হালাল খাবার গ্রহণ করা।
উপরে বর্ণিত শর্তগুলো যার মধ্যে পাওয়া যাবে না তার দুআ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।
❑ বিশেষ তিন ব্যক্তির দু'আ কবুল হবে না:
উপরোল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও আরও তিনজন ব্যক্তির কথা হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যাদের দুআ কবুল করা হবে না। তারা হল: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তিন ব্যক্তি এমন যে তাদের দুআ কবুল করা হয় না। যথা:
— ১. যে ব্যক্তির অধীনে দুশ্চরিত্রা নারী আছে কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না।
— ২. যে ব্যক্তি অন্য লোকের কাছে তার পাওনা আছে কিন্তু সে তার সাক্ষী রাখেনি।
— ৩. যে ব্যক্তি নির্বোধ ব্যক্তিকে সম্পদ দিয়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেন, "তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের সম্পদ দিও না।" [সিলসিলা সহীহা ৪/৪২০]
◈ হাদিসটির ব্যাখ্যা:
◆ এই হাদিসের অর্থ হল, কেউ যদি নিজের দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে তা গৃহীত হবে না। কারণ তার ক্ষমতা ছিল, তাকে তালাক দেওয়ার কিন্তু সে তা করেনি।
◆ কেউ যদি সাক্ষী এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে ঋণ দেয় এবং সে ঋণগ্রহীতা তা অস্বীকার করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ঋণদাতা যদি আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে তা পালন করেনি।
◆ অনুরূপভাবে, কেউ যদি নির্বোধের হাতে তার অর্থ-সম্পদ তুলে দেয় ফলে সে তা আত্মসাৎ করে বা নষ্ট করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে বদদুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ নির্বোধদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া বারণ করেছেন।
মোটকথা, এই ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে নিজের উপরে নিজেই শাস্তি চাপিয়ে নিয়েছে। যার ফলে এই সকল ক্ষেত্রে তার দুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। [ইমাম মুনাবি]
এই হাদিস দ্বারা এটা বোঝায় না যে, তার অন্য কোন দুআ কবুল হবে না। তার অন্যান্য দুআর ক্ষেত্রে এই হাদিস প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
❑ আল্লাহ কেন দুনিয়াতেই আমাদের সব চাওয়া পূরণ করেন না?
আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার অসীম ভবিষ্যৎ জ্ঞানের আলোকে জানেন, কোথায় আমাদের কল্যাণ আছে। কেননা তিনিই আমাদের তকদির লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি অবশ্যই আমাদের কল্যাণ চান। তিনি তার হেকমত অনুযায়ী আমাদের দুআতে সাড়া দিয়ে থাকেন। তাই কখনো কখনো বান্দার দুনিয়াবি চাওয়া পূরণ না করে এর বিনিময়ে তাকে অনাগত বিপদ থেকে রক্ষা করেন অথবা আখিরাতে তার জন্য অনন্ত পুরস্কার জমা রাখেন যা তার জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কখনো কখনো আমরা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমানের অভাবে ও অজ্ঞতা বশত: দুনিয়াতেই সব চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য অস্থির হয়ে যাই!
সুতরাং দুআতে হতাশ হওয়া যাবে না বা বিরক্ত হয়ে দুআ পরিত্যাগ করা যাবে না। বরং ধৈর্যের সাথে দুআ করে যেতে হবে। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন