শাওয়াল মাসের রোযা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল

 শাওয়াল মাসের রোযা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল...


🍁 শাওয়াল মাসের রোযা রাখার ফজিলত:


রমাদ্বানের পরবর্তী চন্দ্রমাস হলো শাওয়াল মাস। এ মাসে ছয়টি নফল রোযা রাখার প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ তার উম্মতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন—“যে ব্যক্তি রমাদ্বানের রোযা রাখল, অতঃপর শাওয়ালে ছয়টি রোযা পালন করল, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল।”

[সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬৪]


🍁 রমাদ্বানের কাযা রোযা রাখার বিধান:


— কাযা রোযা আদায়ের সময়সীমা নির্দিষ্ট নয়; বরং নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত বছরের যেকোনো সময়ে তা আদায় করা জায়েজ। তবে পরবর্তী রমাদ্বানের পূর্বেই আদায় করা উত্তম।


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—


فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ


তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোযা রাখে। আর কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে, সে অন্য দিনগুলোতে (ছুটে যাওয়া রোযার) সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।

[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫]


হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত,

“আমার উপর রমাযানের যে কাযা হয়ে যেত তা পরবর্তী শা‘বান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না।” [সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯৫০]


🍁 কাযা রোযা ও শাওয়ালের ছয় রোযার নিয়ত একসাথে করা যাবে কি?


— না, রমাদ্বানের কাযা রোযা এবং নফল রোযা সতন্ত্র ইবাদত। একই সাথে দুটি রোযার নিয়ত শরীয়তসম্মত না। তাই উভয় রোযার নিয়ত পৃথকভাবে করতে হবে। 

[বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৭; আদ্দুররুল মুখতার ১/৪৪০, ২/১৩; ফাতহুল কাদীর ২/২৪৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৪; ফাতাওয়া খানিয়া ১/২০১]


🍁 যদি দুটো রোযার নিয়ত একইসাথে করা হয়, তবে কোনটা গণ্য হবে?


— ফুকাহায়ে কেরামের স্পষ্ট বক্তব্য হলো,

রযমানের কাযা রোযা এবং শাওয়ালের ছয় রোযা একত্রে নিয়ত করলে শুধু রমযানের কাযা রোযা আদায় হবে। শাওয়ালের ছয় রোযা আদায় হবে না। এবং ছয় রোযার সওয়াবও পাওয়া যাবে না। শাওয়ালের ছয় রোযা রাখতে হলে পৃথকভাবে শুধু এর নিয়তে রোযা রাখতে হবে।

[বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৮; আদ্দুররুল মুখতার ১/৪৪০, ২/১৩; ফাতহুল কাদীর ২/২৪৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৪; ফাতাওয়া খানিয়া ১/২০১]


এ বিষয়টি ফাতাওয়া হিন্দিয়াতেও উল্লেখ রয়েছে—

“একসাথে উভয় নিয়ত করলে তা কাযা হিসেবেই গণ্য হবে; নফল আদায় হবে না।”

[ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৯৭]


🍁 কাযা রোযা আগে রাখবো নাকি শাওয়ালের ৬ রোযা?


— এই বিষয় নিয়ে কিছুটা মতভেদ বা ইখতিলাফ রয়েছে। তবে  হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী সহ অধিকাংশ আলেমের মতে,

আগে রমাদ্বানের কাযা রোযা সমাপ্ত করা উত্তম, এরপর শাওয়ালের রোযা রাখবে। যেহেতু হাদিসে রমাদ্বানের রোযা পূর্ণ করে এরপর শাওয়ালের রোযা রাখার কথা এসেছে। 

তবে কেউ চাইলে আগে শাওয়াল মাসের রোযা রেখে, এরপর সুযোগ বুঝে কাযা রোযা রাখতে পারবে। এমনটি করা মাকরুহ হবে না। কারণ এর দ্বারাও পরবর্তীতে রমাদ্বানের রোযা পূর্ণ করা হচ্ছে।


এর আরেকটি দলিল হচ্ছে, 

আয়িশা (রাযী.) রামাদানের কাজা রোজা শাবান মাসে রাখতেন। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ১৯৫০] 


অতএব শাওয়াল মাসে যেহেতু উনি কাযা রোযা রাখতেন না। সুতরাং তা প্রমাণিত হয় যে, কাযা রোযার পূর্বে শাওয়ালের নফল রোযা রাখা যাবে।


🍁 শাওয়ালের ৬ রোযা ধারাবাহিকভাবে রাখবো নাকি ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখবো?


— শাওয়ালের ৬ রোযা চাইলে ধারাবাহিকভাবে রাখা যাবে। আবার কেউ চাইলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিরতি দিয়েও রাখতে পারবেন। যেভাবেই রাখা হোক না কেন, তা আদায় হয়ে যাবে ইংশাআল্লাহ। 

[লাতাইফুল মাআরিফ ৪৮৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/২১৫; আলমাজমূ ৬/৪২৬-৪২৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৬২; ফাতহুল মুলহিম ৩/১৮৭; আলমুগনী ৪/৪৩৮] [মাসিক আল কাউসার পত্রিকা]


🍁 শাওয়াল মাসের রোযা/আইয়ামে বীজের রোযা/সাপ্তাহিক রোযা একই নিয়তে রাখা যাবে কি? 


— এটা নিয়েও আলেমদের মধ্যে ইখতিলাফ রয়েছে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে,


একাধিক নফল রোযা যদিও পৃথকভাবে রাখা উত্তম তবে একাধিক নফল সিয়ামের নিয়ত একসাথে করলে সবগুলোর সওয়াবই পাওয়া যাবে ইংশাআল্লাহ। কিন্তু ফরজ রোযা (রমাদ্বানের কাযা বা মানত, কাফফারা ইত্যাদি) এর সাথে অন্য কোন নফল রোযার নিয়ত করা জায়েজ নয়। যেমন, আইয়ামে বীজের রোযার সাথে সেই দিনটি যদি সোম বা বৃহস্পতিবার সুন্নত রোযার দিন চলে আসে তবে একই সাথে উভয় রোযার নিয়ত করা যাবে। তেমনিভাবে আইয়ামে বীজের রোযার সাথে শাওয়ালের রোযা একই নিয়তে করা যাবে ইংশাআল্লাহ।


শায়খ ইবনু বায (রাহ.) বলেন, একই নিয়তে শাওয়াল ও আইয়ামে বীযের রোযা রাখলে উভয় সওয়াবের আশা করা যায়। কেননা সে যেভাবে শাওয়ালের ছয় রোযার নিয়তে সত্যবাদী, তেমনি আইয়ামে বীযের রোযার ব্যাপারেও। আর আল্লাহর দান তো প্রশস্ত। (অতএব, আল্লাহ চাইলে উভয়টির সওয়াবই দিতে পারেন)। 

[islamqa dot info; তারিখ: ০৩.১০.২০০৮ ঈসায়ি]


অন্য এক ফাতওয়ায়, 

"আইয়ামে বীয এবং সোম ও বৃহস্পতিবারের রোযা মাসনুন (সুন্নাহ) এবং মুস্তাহাব। কারও সামর্থ্য ও তাওফিক হলে আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেকটি রাখলে, সেটি ফজিলতের ব্যাপার এবং সেটিই উত্তম ও নিয়ম। তবে, কেউ আইয়ামে বীযের রোজা রাখার সময় যদি সোম বা বৃহস্পতিবার এসে যায়, আর সে উভয় রোজার নিয়ত একত্রে করে ফেলে—তাহলে উভয় সওয়াবই পাবে।"

[সূত্র: দারুল উলুম দেওবন্দ, darulifta-deoband dot com; তারিখ: ০৫.০৪.২০১৮]


~ Meherun Nessa

#M_nessa

#Shawal

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন