কথা ও জবান হেফাজত করে আপনাকে ভালো রাখবে এমন কুরআনের ১০টি আয়াত
১. ভালো কথা বলো অথবা চুপ থাকো।
সূরা: আল-ইসরা | আয়াত: ৫৩
আরবি:
وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَغُ بَيْنَهُمْ ۚ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا.
বাংলা অর্থ:
আর আমার বান্দাদের বলো তারা যেন এমন কথা বলে যা সবচেয়ে উত্তম। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
অনুপ্রেরণা:
কথা বলার আগে চিন্তা করতে হবে এটা সবচেয়ে ভালো কথা কিনা। যদি ভালো কথা না হয় তাহলে চুপ থাকা উত্তম। খারাপ কথা শয়তানের কাজ যা মানুষের মধ্যে ঝগড়া সৃষ্টি করে। জবান হেফাজত মানে সবসময় সবচেয়ে ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা।
২. প্রতিটি কথার হিসাব দিতে হবে।
সূরা: ক্বাফ | আয়াত: ১৮
আরবি:
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ.
বাংলা অর্থ:
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে একজন সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।
অনুপ্রেরণা:
প্রতিটি কথা লেখা হচ্ছে। ফেরেশতারা সব কথা রেকর্ড করছে। ভালো কথা নেকি লেখা হয় খারাপ কথা পাপ। এই সত্য মনে রাখলে অযথা কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। কথা বলার আগে মনে করতে হবে ফেরেশতা শুনছে এবং লিখছে। জবান হেফাজত অত্যন্ত জরুরি।
৩. মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকো।
সূরা: আল-হজ্জ | আয়াত: ৩০
আরবি:
ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ ۗ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ ۖ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ.
বাংলা অর্থ:
এই নির্দেশ। আর যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে সম্মান করে তা তার রবের কাছে তার জন্য উত্তম। তোমাদের জন্য গবাদি পশু হালাল করা হয়েছে তা ছাড়া যা তোমাদের কাছে পাঠ করা হয়। সুতরাং মূর্তির অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকো।
অনুপ্রেরণা:
মিথ্যাকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটাই মিথ্যার ভয়াবহতা। মিথ্যা বলা মহাপাপ। ছোট মিথ্যা বড় মিথ্যা সব হারাম। হাসি ঠাট্টায়ও মিথ্যা বলা যায় না। জবান হেফাজতের প্রথম শর্ত হলো মিথ্যা থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা।
৪. গীবত করো না।
সূরা: আল-হুজুরাত | আয়াত: ১২
আরবি:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ.
বাংলা অর্থ:
হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দ করো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।
অনুপ্রেরণা:
গীবত মানে কারো অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে শুনলে কষ্ট পাবে। এটা মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য। জবানের সবচেয়ে বড় গুনাহ গুলোর একটি হলো গীবত। কারো পিছনে তার দোষ বলা বন্ধ করতে হবে। জবান হেফাজতের জন্য গীবত সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে।
৫. ভালো কথা সদকার সমান।
সূরা: আল-বাক্বারা | আয়াত: ২৬৩
আরবি:
قَوْلٌ مَّعْرُوفٌ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِّن صَدَقَةٍ يَتْبَعُهَا أَذًى ۗ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَلِيمٌ.
বাংলা অর্থ:
ভালো কথা ও ক্ষমা এমন দান অপেক্ষা উত্তম যার পরে কষ্ট দেওয়া হয়। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত সহনশীল।
অনুপ্রেরণা:
ভালো কথা বলা সদকার চেয়েও উত্তম যদি সদকার পর কষ্ট দেওয়া হয়। মিষ্টি কথা, সান্ত্বনার কথা, উৎসাহের কথা এগুলো বড় নেকি। টাকা না থাকলেও ভালো কথা বলে সদকা করা যায়। জবান দিয়ে মানুষকে খুশি করা এবং কষ্ট দূর করা মহান ইবাদত।
৬. কোমল ভাষায় কথা বলো।
সূরা: ত্বা-হা | আয়াত: ৪৪
আরবি:
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ.
বাংলা অর্থ:
অতঃপর তোমরা তাকে নরম কথা বলো যাতে সে উপদেশ গ্রহণ করে অথবা ভয় করে।
অনুপ্রেরণা:
আল্লাহ মুসা ও হারুনকে ফিরাউনের কাছে পাঠালেন এবং বললেন নরম ভাষায় কথা বলতে। ফিরাউন আল্লাহদ্রোহী হওয়া সত্ত্বেও তার সাথে কোমল কথা বলতে হবে। তাহলে সাধারণ মানুষের সাথে কত কোমল হতে হবে। কঠোর ভাষা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। নরম ভাষা হৃদয় জয় করে।
৭. অহেতুক কথা থেকে বিরত থাকো।
সূরা: আল-মুমিনুন | আয়াত: ৩
আরবি:
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ.
বাংলা অর্থ:
আর যারা অর্থহীন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।
অনুপ্রেরণা:
মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা বেকার কথা বলে না। অযথা কথা, গল্প, হাসি ঠাট্টা এসব থেকে দূরে থাকে। যে কথায় কোনো ফায়দা নেই সে কথা না বলাই ভালো। জবান হেফাজত মানে প্রয়োজনীয় কথা বলা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা।
৮. প্রতিশ্রুতি রক্ষা করো।
সূরা: আল-ইসরা | আয়াত: ৩৪
আরবি:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا.
বাংলা অর্থ:
আর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
অনুপ্রেরণা:
জবান দিয়ে যে ওয়াদা করা হয় তা রক্ষা করা ফরজ। মুখে বলে কাজ না করা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য। যে কথা দিয়ে রাখে না সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন। তাই যে ওয়াদা রাখতে পারবে না সেটা না করাই ভালো।
৯. ঝগড়া বিতর্ক এড়িয়ে চলো।
সূরা: আল-মুমিনুন | আয়াত: ৯৬
আরবি:
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ ۚ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ.
বাংলা অর্থ:
তুমি মন্দকে উত্তম দ্বারা প্রতিহত করো। তারা যা বলে আমি তা ভালো জানি।
অনুপ্রেরণা:
কেউ খারাপ কথা বললে খারাপ কথায় জবাব না দিয়ে ভালো কথা বলতে হবে। ঝগড়া বিতর্কে জড়ানো জবানের খারাপ ব্যবহার। কেউ গালি দিলে গালি না দিয়ে সুন্দর উত্তর দিতে হবে। এটাই জবান হেফাজত। মন্দের বদলে ভালো করলে শত্রু বন্ধু হয়ে যায়।
১০. জবান আল্লাহর জিকিরে ব্যবহার করো।
সূরা: আল-আহযাব | আয়াত: ৪১-৪২
আরবি:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا.
বাংলা অর্থ:
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো। এবং সকাল সন্ধ্যায় তাঁর তসবিহ পাঠ করো।
অনুপ্রেরণা:
জবানের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হলো আল্লাহর জিকির করা। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলা। কুরআন তিলাওয়াত করা। দোয়া করা। জবান যখন আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকবে তখন খারাপ কথা বলার সুযোগ থাকবে না। জবান হেফাজতের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বেশি বেশি জিকির করা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে জবান হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। যেন আমরা শুধু ভালো কথা বলতে পারি এবং খারাপ কথা থেকে বেঁচে থাকতে পারি। আমাদের জবানকে আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত রাখুন। আমিন।
#জবানহেফাজত #কথারআদব #ভালোকথা #মিথ্যামুক্ত #গীবতমুক্ত #কুরআন #ইসলাম #আল্লাহ #ঈমান #ইসলামিকপোস্ট #জিকির #সুন্দরভাষা #মুসলিম #ইসলামিকজ্ঞান
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন