জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন (যাকে আশুরায়ে যিলহজ বা দশকের দিন বলা হয়) ইসলামী বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিন

 


 জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন (যাকে আশুরায়ে যিলহজ বা দশকের দিন বলা হয়) ইসলামী বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আল্লাহর কাছে এমন কোনো দিন নেই যেদিনের নেক আমল এই দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।” (সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন: জিহাদও নয়? তিনি বললেন: জিহাদও নয়, তবে যে ব্যক্তি জান-মাল নিয়ে জিহাদে গিয়ে কিছুই ফিরিয়ে আনেনি সে ছাড়া।)
✅ ফজিলতের প্রমাণ (কুরআন ও হাদিস)
▪️কুরআন: সূরা আল-ফাজরের প্রথম দুই আয়াতে আল্লাহ শপথ করেছেন—
“ওয়াল ফাজরি, ওয়া লাইয়ালিন ‘আশর” (শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের)।
ইবনে আব্বাস (রা.) ও অন্যান্য তাফসিরবিদদের মতে, এই “দশ রাত” বলতে জিলহজের প্রথম দশ রাত (অর্থাৎ প্রথম ১০ দিন) বোঝানো হয়েছে। এই শপথ এই দিনগুলোর মহত্ত্ব প্রমাণ করে।
▪️হাদিস: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“এমন কোনো দিন নেই যাতে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম ১০ দিন) আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।”
সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের চেয়েও?”
তিনি বললেন, “জিহাদের চেয়েও, তবে যে ব্যক্তি জান-মাল নিয়ে জিহাদে বের হয় এবং কিছুই ফিরিয়ে আনে না (শহীদ হয়)।”
(সহীহ বুখারী: ৯৬৯; তিরমিযী; অন্যান্য)।
আরেক হাদিসে:
“আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় ও মহান আমল আর নেই।” (মুসনাদ আহমাদ, সহীহ)।
এই দিনগুলোতে সকল নেক আমল (সালাত, সিয়াম, সদকা, জিকির, তিলাওয়াত, তাওবা ইত্যাদি) বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
✅ জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ (বিস্তারিত রেফারেন্সসহ)
নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো প্রধান আমলগুলো। যতটা সম্ভব ফরজ-ওয়াজিব আগে, তারপর সুন্নাত-মুস্তাহাব।
১. ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা এবং হারাম থেকে বিরত থাকা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফরজ নামাজ জামাতে পড়া, সময়মতো আদায় করা, যাকাত-ফিতরা ইত্যাদি যথাসময়ে দেয়া।
ফরজের উপর নেক আমলের ভিত্তি দাঁড়ায়।
২. তাওবা-ইস্তিগফার করা
প্রথমেই গুনাহ থেকে তাওবা করুন। খাঁটি তাওবা (নিয়ত, অনুতাপ, গুনাহ ছেড়ে দেয়া এবং আর না করার সংকল্প)।
এই দিনগুলোতে তাওবা বিশেষভাবে কবুল হয়।
৩. নফল রোজা রাখা (প্রথম ৯ দিন)
রাসূল (সা.) এই ৯ দিন রোজা রাখতেন।
হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সা.) “আশূরার রোজা, জিলহজের প্রথম ৯ দিনের রোজা, প্রতি মাসের ৩ দিন রোজা এবং ফজরের আগে ২ রাকাত” কখনো ছেড়ে দিতেন না। (আহমাদ, নাসায়ী)।
একদিন রোজা রাখলে ৭০ বছরের দূরত্ব পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হয় (বুখারী-মুসলিম)।
৪. আরাফার দিন (৯ জিলহজ) রোজা রাখা
সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা।
রাসূল (সা.) বলেছেন: “আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে।” (সহীহ মুসলিম)।
(হাজীদের জন্য রোজা না রাখাই উত্তম, কারণ দোয়া ও ইবাদতে ব্যস্ত থাকবেন)।
৫. অধিক পরিমাণে জিকির, তাকবীর, তাহমীদ, তাহলীল করা
রাসূল (সা.) বলেছেন:
“এই দশ দিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে বড় কোনো দিন নেই... তাই এতে অধিক তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) বলো।” (মুসনাদ আহমাদ, সহীহ)।
ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা (রা.) বাজারে গিয়ে তাকবীর বলতেন, লোকেরা তাঁদের অনুসরণ করত (বুখারী)।
তাকবীরে তাশরীক (৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত):
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ” — ফরজ নামাজের পর বলা ওয়াজিব (পুরুষদের জন্য জোরে)।
৬. কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও রাতে ইবাদত (তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ)
কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি অক্ষরে ১০ গুণ সওয়াব।
রাত জেগে নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, দোয়া বাড়ান। দোয়া ইবাদতের মূল।
৭. সদকা ও দান-খয়রাত
যেকোনো পরিমাণ সদকা (টাকা, খাবার, সাহায্য)। এই দিনে সদকার সওয়াবও বহুগুণ।
৮. কুরবানি করা (সামর্থ্যবানদের জন্য)
১০ জিলহজ (ঈদুল আজহা) থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত।
যারা সামর্থ্যবান, তাদের জন্য ওয়াজিব (হানাফী মতে) বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
কুরবানির দিনকে “ইয়াওমুল হজ্জিল আকবর” (শ্রেষ্ঠ হজের দিন) বলা হয় (আবু দাউদ, সহীহ)।
৯. চুল, নখ, শরীরের লোম না কাটা (কুরবানি করলে)
যারা কুরবানি করবেন, জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত চুল-নখ না কাটা সুন্নাত (মুস্তাদরাক হাকিম)।
১০. অন্যান্য নেক আমল
সম্পর্ক মেরামত করা
মা-বাবা-আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেয়া
ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ
হজ করা (যারা সামর্থ্যবান ও যোগ্য)
✅ বিশেষ টিপস
▪️প্রথম ৯ দিন রোজা রাখুন (বিশেষ করে ৯ তারিখ)।
▪️১০ তারিখ (ঈদ) রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
▪️তাকবীরে তাশরীক ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত বলুন।
▪️যত বেশি সম্ভব মসজিদে সময় কাটান, দোয়া করুন।
এই দিনগুলোতে ছোট ছোট আমলও বিরাট সওয়াবের কারণ হয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই বরকতময় দিনগুলোতে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন এবং কবুল করুন। আমীন।
সূত্র: উপরোক্ত হাদিসসমূহ সহীহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, আহমাদ, নাসায়ী ইত্যাদি থেকে সংগৃহীত।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন