একজন সাহাবী লুকিয়ে কয়েকজন মহিলার কথা শুনছেন। মহিলারা রাতের বেলা নিজেদের মতো করে আড্ডা দিচ্ছে, তিনি আড়ালে থেকে তাদের গল্প শুনছেন।তাঁর নাম ছিলো খুয়াইত ইবনে আমর আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি পরিচিত ছিলেন 'আবু আব্দুল্লাহ' নামে।যখন তিনি মহিলাদের গল্প শুনছিলেন, তখন দেখতে পেলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসছেন। কী বিব্রতকর অবস্থা! লুকিয়ে মহিলাদের গল্প শুনাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখলে তিনি কী জবাব দিবেন? মনে মনে একটি অজুহাত খুঁজলেন।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখামাত্র জিজ্ঞেস করলেন, "ও আবু আব্দুল্লাহ! তুমি এখানে কী করছো?"আবু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার উট হারিয়ে গেছে। আমি আমার উট খুঁজছি।"বিব্রতকর অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেন।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জবাব শুনে চলে যান।ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার তাঁকে সেই জায়গায় দেখলেন।এবার জিজ্ঞেস করলেন, "ও আবু আব্দুল্লাহ! তুমি তোমার উট এখনো খুঁজে পাওনি?"আগের চেয়ে এবার তিনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কিছু বললেন না।এরপর থেকে খুয়াইত আল আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এড়িয়ে চলতেন, তাঁর মুখোমুখি হতেন না। সেদিনের বিব্রতকর অবস্থা তিনি ভুলতে পারেন না। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে নববীতে যাওয়া বন্ধ করে দেন। ঐখানে গেলে তো রাসূলের সাথে দেখা হবে!রাসূলের যুগে মদীনায় মসজিদে নববী ছাড়াও আরো মসজিদ ছিলো।অনেকদিন পর খুয়াইত মসজিদে নববীতে যান। তিনি ভাবেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো সেদিনের ঘটনা ভুলে গেছেন। তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়া শুরু করেন।'যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়'।খুয়াইত আল-আসলামী দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রাসূলকে দেখে তিনি নামাজ লম্বা করলেন। তিনি ভাবলেন, তার দীর্ঘ নামাজ দেখে রাসূলুল্লাহ যদি চলে যান, তাহলে তো ভালোই, বাঁচা গেলো।তিনি নামাজ পড়ছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, "তোমার যতোক্ষণ ইচ্ছে নামাজ পড়ো। আমি কোথাও যাচ্ছি না!"খুয়াইত আল-আসলামী নামাজ শেষ করলেন। নামাজ শেষ করতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ও আবু আব্দুল্লাহ! তোমার হারানো উট কি খুঁজে পেয়েছো?"খুয়াইত ভাবলেন, আর মিথ্যা বলে লাভ নেই। সত্যবলতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে তিনি বুঝতে পারছেন, রাসূলুল্লাহ হয়তো জেনে গেছেন তিনি মিথ্যা বলছেন। এজন্য বারবার তাকে ঐদিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মজা করছেন।"ইয়া রাসূলাল্লাহ! যেই আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তার কসম করে বলছি! ইসলাম গ্রহণের পর আমার কোনো উট হারায়নি। সেদিন আমি মিথ্যে বলেছিলাম।"রাসুল সাঃ এমন মানুষ ছিলেন কাউকে লজ্জা দিতেন না কিন্ত অন্যায় কাজের জন্য এমনভাবে কথা বলতেন সে মানুষটা অনুতপ্ত হয়ে যেত।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য দু'আ করলেন, "আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন, আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন, আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন।"একই দু'আ তিনবার করেন।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজাচ্ছলে খুয়াইত আল-আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বুঝালেন, মিথ্যা বলে পার পাওয়া যায় না। জীবনের যেকোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ো না কেনো, সবসময় সত্য বলবে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে মিথ্যা বললে সেই মিথ্যা বলার কারণে অসংখ্যবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। তখন ঐ মিথ্যার জন্য আফসোস করতে হবে। অথচ ঐ একবার সত্য বললে সাময়িক লজ্জাবোধ হলেও পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যাবে।এরপর থেকে খুয়াইত আল-আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু লুকিয়ে লুকিয়ে মহিলাদের কথা শুনতেন না, বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা বলতেন না।তথ্যসূত্র:তাবাকাত ইবনে সা'দ: ৩/ ৩৬২-৩৬
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন