৮০ হিজরীর আগে কোন মাযহাব ছিল? একটি যৌক্তিক প্রশ্ন!


"ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যার মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক মুসলিম ভাই না বুঝে এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করেন যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী। 
বিশেষ করে 'মাযহাব' মানাকে 'ফরয' হিসেবে সাব্যস্ত করা এক ধরনের তথ্যগত বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। এই ফরয হওয়ার বিধানটি আসলে কে দিয়েছে—আল্লাহ নাকি তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)?
সত্যের অনুসন্ধানে আসুন আমরা ইতিহাসের আলোকে কিছু মৌলিক বিষয়ের ব্যবচ্ছেদ করি।"
বর্তমানে অনেক মাথামো*টা-কে বলতে শোনা যায় যে, চার মাযহাবের যেকোনো একটি মানা 'ফরয'। এই দাবিটি কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথেও সাংঘর্ষিক। 
প্রশ্ন জাগে - এই 'ফরয' হওয়ার ঘোষণা কে দিল? আল্লাহ নাকি তাঁর রাসূল (ছা.)?
মাযহাবের ইতিহাস এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে আমাদের কিছু মৌলিক সত্য উপলব্ধি করা প্রয়োজনঃ-
ইসলামের চারজন প্রসিদ্ধ ইমাম অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং তাঁরা দ্বীনের অনেক খেদমত করে গেছেন। তবে তাদের জন্মের আগে আজ যে নামে আমরা মাযহাবগুলো দেখি, তার অস্তিত্ব ছিল না। 
নিচে তাঁদের সময়কাল উল্লেখ করা হলোঃ-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) জন্ম ৮০ হিজরী, মৃত্যু ১৫০ হিজরী।
ইমাম মালেক (রহ.) জন্ম ৯৩ হিজরী,
মৃত্যু ১৭৯ হিজরী।
ইমাম শাফিঈ (রহ.) জন্ম ১৫০ হিজরী,
মৃত্যু ২০৪ হিজরী।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) জন্ম
১৬৪ হিজরী, মৃত্যু ২৪১ হিজরী।
৮০ হিজরীর পূর্বে কোন মাযহাব ছিল?
যদি মাযহাব মানা ফরয হতো, তবে ৮০ হিজরীর আগে বা ইমামগণের জন্মের আগে যে মুসলিমরা ছিলেন, তাঁরা কোন মাযহাবের ওপর ছিলেন? 
ইসলামের ইতিহাসের একটি অকাট্য বাস্তবতা। ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর জন্ম ৮০ হিজরীতে। এর আগের সময়কালকে আমরা প্রধানত তিনটি ভাগে দেখতে পারি, রাসূল (ছা.)-এর যুগ, খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ এবং সাহাবা ও বড় তাবেয়ীদের যুগ।
​রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সময় এবং পরবর্তী সাহাবায়ে কেরামের যুগে দ্বীনের একমাত্র উৎস ছিল আল্লাহর ওহী। রাসূল (ছা.) বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্টভাবে বলে গেছেন,
​"আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ (হাদীস)।"
 (মুয়াত্তা মালেক, মিশকাত হা/১৮৬)
​অর্থাৎ, ৮০ হিজরীর আগের মুসলমানরা সরাসরি এই দুই উৎসের অনুসারী ছিলেন। তখন কোনো বিশেষ ব্যক্তির নামে 'মাযহাব' বা আলাদা কোনো দল ছিল না।
​সাহাবায়ে কেরামের যুগ (খাইরুল কুরুন) ​রাসূল (ছা.)-এর ইন্তেকালের পর থেকে ৮০ হিজরী পর্যন্ত সময়কালটি ছিল সাহাবায়ে কেরাম এবং প্রবীণ তাবেয়ীদের স্বর্ণযুগ। নবীজি (ছা.) এই সময়কাল সম্পর্কে বলেছেন,
​"সবচেয়ে উত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর তার পরবর্তী যুগ (তাবেয়ী), তারপর তার পরবর্তী যুগ (তাবে-তাবেয়ী)।" 
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
​ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর জন্মের আগে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা.) এবং অন্যান্য বড় বড় সাহাবীগণ বেঁচে ছিলেন। তাঁরা কখনোই নিজেদের নামে কোনো মাযহাব তৈরি করেননি।
বরং তাঁদের পথ ছিল, 'রাসূল (ছা.) যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা'।
​৮০ হিজরীর আগে মুসলমানরা 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত' বা সহজ কথায় কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। তখন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামতের ওপর ভিত্তি করে 'মাযহাব' বা দল গঠিত হয়নি। সুতরাং, আজ যারা মাযহাব মানাকে 'ফরয' বলেন, তাঁদের দাবিটি ইসলামের প্রাথমিক তিন যুগের (যাকে নবীজি শ্রেষ্ঠ যুগ বলেছেন) ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামের ভিত্তি কোনো ব্যক্তির জন্মের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা ওহীর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
কোনো নির্দিষ্ট ইমামের ইজতিহাদ বা গবেষণা থেকে সাহায্য নেওয়া আর সেটিকে 'ফরয' বানিয়ে দেওয়া—দুটি ভিন্ন বিষয়। মাযহাবের নামে উম্মাহকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা সুক্ষ্ম কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। দ্বীনের ভিত্তি হতে হবে একমাত্র ওহী (কুরআন ও সহীহ হাদীস), কোনো ব্যক্তির মতামত নয়।
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো..." (সূরা আন-নিসা আয়াত ৫৯)
চার ইমাম কখনোই তাঁদের কথাকে অন্ধভাবে মানার নির্দেশ দিয়ে যাননি, বরং তাঁরা সর্বদা কুরআন ও সহীহ হাদীসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সুতরাং, মাযহাবের নামে বাড়াবাড়ি বা একে ফরয ঘোষণা করা ইসলামের সঠিক তথ্য বিকৃতির শামিল। 
পরিশেষে বলতে চাই, দ্বীনের পূর্ণতা নবী মুহাম্মদ (ছা.)-এর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে এবং হিদায়াতের মাপকাঠি হিসেবে তিনি আমাদের মাঝে কুরআন ও সুন্নাহকে রেখে গেছেন। 
শ্রদ্ধেয় ইমামগণ কখনোই নতুন কোনো ধর্ম প্রচার করেননি, বরং তাঁরা সাধ্যমতো কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন মাত্র। তাঁদের কারো প্রতি অন্ধভক্তি প্রদর্শন করে কুরআন-সুন্নাহর সমান্তরাল দাঁড় করানো কিংবা মাযহাব অনুসরণকে 'ফরয' সাব্যস্ত করা প্রকারান্তরে আল্লাহর শরীয়তকে সংকুচিত করার শামিল।
​আমাদের মনে রাখতে হবে, পরকালে আমরা নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসারী কি না সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হব না, বরং আমাদের বিচার হবে আমরা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহকে কতটা অনুসরণ করেছি তার ভিত্তিতে। 
সুতরাং, ইসলামের নামে দল-উপদল সৃষ্টি না করে এবং সংকীর্ণ মতাদর্শে উম্মাহকে বিভক্ত না করে, আসুন আমরা সবাই ইসলামের মূল উৎসে ফিরে যাই। আমাদের পথপ্রদর্শক হোক একমাত্র আল-কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। আল্লাহ আমাদের সত্য বোঝার ও সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
 


 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন