সূরা আম্বিয়া—৫ জন নবীর ৫টা দোয়া, ৫টা সমস্যার সমাধান

 সূরা আম্বিয়া—৫ জন নবীর ৫টা দোয়া, ৫টা সমস্যার সমাধান

একটা সূরায় ৫ জন নবী। ৫টা ভিন্ন সংকট। ৫টা ভিন্ন দোয়া। আর ৫ বারই আল্লাহ সাড়া দিয়েছেন।

কখনো ভেবে দেখেছেন — আল্লাহ কেন এত নবীর দোয়া একটা সূরায় একসাথে রেখেছেন?

কারণ আমাদের জীবনেও এই ৫টা সংকট আসে। রোগ আসে। অন্ধকার আসে। একাকীত্ব আসে। বিপদ আসে। জুলুম আসে।

আর আল্লাহ চান — আপনি যখন এই সংকটে পড়বেন, তখন যেন জানেন ঠিক কোন দোয়া পড়তে হবে।

সূরা আম্বিয়া মক্কী সূরা। আয়াত সংখ্যা ১১২। এই সূরায় আল্লাহ ১৬ জনের বেশি নবীর কথা বলেছেন। কিন্তু ৫ জনের দোয়া আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন — আর প্রতিটার পর বলেছেন "ফাস্তাজাবনা" — "আমি সাড়া দিয়েছি।"

আজকের পোস্টে সেই ৫টা দোয়া — ৫টা সমস্যার সমাধান।

দোয়া ১: আইয়ুব (আ.) — যখন রোগে শরীর শেষ, আর সহ্য হচ্ছে না

আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর অসুস্থ ছিলেন। শরীরে এমন রোগ যে মানুষ কাছে আসতো না। সম্পদ গেছে। সন্তান গেছে। সবাই ছেড়ে গেছে। শুধু স্ত্রী পাশে ছিলেন।

১৮ বছর। একদিন না, একমাস না — ১৮ বছর।

কিন্তু তিনি একটিবারও বলেননি — "আল্লাহ আমার সাথে অন্যায় করেছেন।"

তিনি শুধু বলেছেন —

أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

উচ্চারণ: আন্নি মাস্সানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন

"আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।"

(সূরা আম্বিয়া: ৮৩)

খেয়াল করুন — তিনি বলেননি "আমাকে সুস্থ করুন।" তিনি শুধু কষ্টের কথা জানিয়েছেন আর আল্লাহর দয়ার কথা স্মরণ করেছেন। অভিযোগ নেই। দাবি নেই। শুধু আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা।

আল্লাহ বলেন — "ফাস্তাজাবনা লাহু" — আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। তাঁর রোগ দূর করলাম। পরিবার ফিরিয়ে দিলাম। দ্বিগুণ করে দিলাম।

কখন পড়বেন? যখন দীর্ঘদিন অসুস্থ। যখন ওষুধে কাজ হচ্ছে না। যখন শরীর আর সায় দিচ্ছে না।

দোয়া ২: ইউনুস (আ.) — যখন চারদিক থেকে অন্ধকার, কোনো পথ নেই

ইউনুস (আ.) মাছের পেটে। সমুদ্রের গভীরে। রাতের অন্ধকার। পানির অন্ধকার। মাছের পেটের অন্ধকার। তিন স্তরের অন্ধকার।

কোনো মানুষ জানে না তিনি কোথায়। কেউ সাহায্য করার নেই। কোনো উপায় নেই। শুধু আল্লাহ।

সেখান থেকে তিনি ডাকলেন —

لَّا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন

"আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।"

(সূরা আম্বিয়া: ৮৭)

আল্লাহ বলেন — "ফাস্তাজাবনা লাহু ওয়া নাজ্জাইনাহু মিনাল গাম্ম" — আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করলাম।

তারপর আল্লাহ একটা অসাধারণ কথা বললেন — "ওয়া কাযালিকা নুনজিল মুমিনীন" — আমি এভাবেই মুমিনদের উদ্ধার করি।

মানে এই দোয়া শুধু ইউনুস (আ.)-এর জন্য না — প্রতিটা মুমিনের জন্য।

নবীজি ﷺ বলেছেন — "যুন-নুনের দোয়া — যেকোনো মুসলিম যেকোনো বিষয়ে এই দোয়া করলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন।" (জামে তিরমিযী: ৩৫০৫)

কখন পড়বেন? যখন চারদিক থেকে অন্ধকার। চাকরি নেই, টাকা নেই, সাহায্যকারী নেই। যখন মনে হয় কোনো পথ নেই।

দোয়া ৩: যাকারিয়া (আ.) — যখন কিছু চান কিন্তু পাচ্ছেন না, বছরের পর বছর

যাকারিয়া (আ.) সন্তান চাইছিলেন। কিন্তু স্ত্রী বন্ধ্যা। নিজে বৃদ্ধ। চুল সাদা। হাড় দুর্বল। সব হিসাব বলছে — অসম্ভব।

কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে বললেন —

رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ

উচ্চারণ: রাব্বি লা তাযারনি ফারদান ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন

"হে আমার রব, আমাকে একা রাখবেন না। আর আপনি তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।"

(সূরা আম্বিয়া: ৮৯)

আল্লাহ বলেন — "ফাস্তাজাবনা লাহু ওয়া ওয়াহাবনা লাহু ইয়াহইয়া" — আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে ইয়াহইয়া দান করলাম।

বৃদ্ধ বয়সে। বন্ধ্যা স্ত্রীর গর্ভে। যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসম্ভব — আল্লাহর কাছে সম্ভব।

কখন পড়বেন? যখন সন্তান হচ্ছে না। যখন কোনো কিছু চাইছেন কিন্তু বছরের পর বছর পাচ্ছেন না। যখন সব হিসাব বলছে "অসম্ভব" — কিন্তু আপনি আল্লাহর কাছে সম্ভব বিশ্বাস করেন।

দোয়া ৪: ইবরাহীম (আ.) — যখন মানুষ আপনার বিরুদ্ধে, সত্যের পথে একা

ইবরাহীম (আ.) একা। পুরো জাতি তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁকে আগুনে ফেলা হলো। বিশাল আগুন। এত বড় যে কাছে যাওয়া যায় না — তাই পাথর নিক্ষেপক দিয়ে ছুড়ে ফেলা হলো।

সেই মুহূর্তে জিবরীল (আ.) এসে বললেন — "কোনো সাহায্য দরকার?"

ইবরাহীম (আ.) বললেন — "আপনার কাছে না। আল্লাহর কাছে।"

আর আল্লাহ বললেন —

قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ

উচ্চারণ: কুলনা ইয়া নারু কুনি বারদান ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম

"আমি বললাম — হে আগুন, ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।"

(সূরা আম্বিয়া: ৬৯)

আগুন তাঁকে পোড়ায়নি। আল্লাহ আগুনকেই বদলে দিয়েছেন।

আর এই সূরায় আল্লাহ ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কে বলেছেন — "ওয়া নাজ্জাইনাহু" — আমি তাঁকে উদ্ধার করেছি।

কখন পড়বেন? যখন সত্যের পথে একা। মানুষ বিরুদ্ধে। পরিবার বিরুদ্ধে। সমাজ বিরুদ্ধে। যখন দ্বীন মানতে গিয়ে "আগুনে" পড়েছেন — চাকরির আগুন, সামাজিক চাপের আগুন, পরিবারের বিরোধিতার আগুন। আল্লাহ সেই আগুনকেও শীতল করতে পারেন।

দোয়া ৫: লুত (আ.) — যখন জুলুমের বিরুদ্ধে সাহায্য দরকার

লুত (আ.)-এর জাতি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নোংরা জাতিগুলোর একটা। তাদের পাপ এত ছড়িয়ে গেছিল যে লুত (আ.) একা কিছুই করতে পারছিলেন না।

তিনি আল্লাহর কাছে বললেন —

رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

উচ্চারণ: রাব্বিনসুরনি আলাল কাওমিল মুফসিদীন

"হে আমার রব, ফাসাদকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।"

(সূরা আম্বিয়া: ৭৭, সূরা আনকাবুত: ৩০)

আল্লাহ সাড়া দিলেন। লুত (আ.) ও তাঁর পরিবারকে বাঁচালেন। আর ফাসাদকারীদের ধ্বংস করলেন।

কখন পড়বেন? যখন জালিমের জুলুম সহ্য হচ্ছে না। যখন চারপাশে অন্যায় দেখছেন কিন্তু কিছু করতে পারছেন না। যখন সমাজের পচন আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে।

৫টা দোয়া — এক নজরে

আইয়ুব (আ.) — রোগে পড়লে পড়ুন:

"আন্নি মাস্সানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন"


ইউনুস (আ.) — অন্ধকারে পড়লে পড়ুন:

"লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন"


যাকারিয়া (আ.) — কিছু চেয়ে পাচ্ছেন না পড়ুন:

"রাব্বি লা তাযারনি ফারদান ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন"


ইবরাহীম (আ.) — সত্যের পথে একা পড়লে বলুন:

"হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকীল"


লুত (আ.) — জুলুমের বিরুদ্ধে পড়ুন:

"রাব্বিনসুরনি আলাল কাওমিল মুফসিদিন"


আর প্রতিটার পর আল্লাহর উত্তর একই — "ফাস্তাজাবনা" — আমি সাড়া দিয়েছি।

একটা কথা মনে রাখুন — এই ৫টা দোয়া শুধু ৫ জন নবীর জন্য ছিল না। আল্লাহ এগুলো কুরআনে রেখেছেন আমাদের জন্য। ইউনুস (আ.)-এর দোয়ার পর আল্লাহ নিজেই বলেছেন — "ওয়া কাযালিকা নুনজিল মুমিনীন" — এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি। মানে এই দোয়াগুলো আমার, আপনার — সবার জন্য।

কিন্তু শুধু সূরা আম্বিয়া না — কুরআনের পাতায় পাতায় এরকম শত শত দোয়া ছড়িয়ে আছে। রিজিকের দোয়া, শিফার দোয়া, সন্তানের দোয়া, ক্ষমার দোয়া, জান্নাতের দোয়া — প্রতিটা সমস্যার জন্য আল্লাহ নিজেই শিখিয়ে দিয়েছেন কী বলতে হবে।

মনে রাখবেন!

৫ জন নবী। ৫টা ভিন্ন সংকট। কিন্তু একটা কমন জিনিস — তাঁরা সবাই আল্লাহর কাছে ফিরেছেন। মানুষের কাছে না। ক্ষমতার কাছে না। টাকার কাছে না। শুধু আল্লাহর কাছে।

আর আল্লাহ প্রতিবার সাড়া দিয়েছেন। একবারও "না" বলেননি।

আপনার জীবনে এখন কোন সংকট চলছে?

রোগ? আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া পড়ুন।

অন্ধকার? ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পড়ুন।

কিছু পাচ্ছেন না? যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া পড়ুন।

একা আছেন? ইবরাহীম (আ.)-এর ভরসা রাখুন।

জুলুম সহ্য হচ্ছে না? লুত (আ.)-এর দোয়া পড়ুন।

আল্লাহ "ফাস্তাজাবনা" বলেছেন — আমি সাড়া দিয়েছি। তিনি আপনার ডাকেও সাড়া দেবেন। শুধু ডাকুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটা সংকটে নবীদের দোয়া পড়ার তাওফিক দিন। আমাদের ডাকে সাড়া দিন। বিপদ দূর করুন। আর "ফাস্তাজাবনা"-র বরকত আমাদের জীবনে নাযিল করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

— সূরা আম্বিয়া: ৬৯, ৭৭, ৮৩-৮৪, ৮৭-৮৮, ৮৯-৯০

— সূরা আনকাবুত: ৩০

— জামে তিরমিযী: ৩৫০৫

— তাফসীরে ইবনে কাসীর


/EKRAMHOSSAIN

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন