সন্তানের জন্য কি দোয়া করেন? — কুরআনে ৫ জন নবীর ৫টা দোয়া
সন্তানের জন্য আমরা কত কিছু করি।
ভালো স্কুলে ভর্তি করাই। কোচিং দিই। ভালো খাবার দিই। সুন্দর জামা কিনে দিই। ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাই।
কিন্তু একটা প্রশ্ন — সন্তানের জন্য কি দোয়া করি?
রাতে ঘুমানোর আগে সন্তানের মাথায় হাত রেখে কি আল্লাহর কাছে কাঁদি? সেজদায় গিয়ে কি সন্তানের নাম ধরে চাই? তাহাজ্জুদে কি সন্তানের হেদায়াতের জন্য চোখের পানি ফেলি?
স্কুল সন্তানকে ডিগ্রি দেবে। কিন্তু হেদায়াত? সেটা আল্লাহর হাতে। আর আল্লাহর কাছে চাইতে হয় দোয়া দিয়ে।
কুরআনে ৫ জন নবী তাঁদের সন্তানের জন্য ৫টা আলাদা দোয়া করেছেন। প্রতিটা দোয়ায় আলাদা চাওয়া। আলাদা প্রয়োজন। আলাদা পরিস্থিতি।
আজ এই ৫টা দোয়া শিখুন — আর আজ রাত থেকেই সন্তানের জন্য পড়া শুরু করুন।
---
দোয়া ১: ইবরাহীম (আ.) — সন্তান যেন নামাজী হয়
ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর খলীল — আল্লাহর অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি সন্তানের জন্য টাকা চাননি, ক্ষমতা চাননি, বড় বাড়ি চাননি।
তিনি চেয়েছেন — আমার সন্তান যেন নামাজী হয়।
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
উচ্চারণ: রাব্বিজআলনি মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিইয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ।
"হে আমার রব, আমাকে এবং আমার বংশধরদের নামাজ কায়েমকারী বানান। হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করুন।"(সূরা ইবরাহীম: ৪০)
খেয়াল করুন — তিনি শুধু নিজের জন্য চাননি, "ওয়া মিন যুররিইয়্যাতি" — আমার বংশধরদেরও। মানে শুধু ছেলে-মেয়ে না, নাতি-নাতনি, তাদের সন্তান — পুরো বংশ।
কখন পড়বেন? যখন সন্তান নামাজ পড়ে না। যখন নামাজের কথা বললে মুখ ভার করে। এই দোয়া প্রতি ফরজ নামাজের শেষ বৈঠকে, সালাম ফেরানোর আগে পড়ুন।
---
দোয়া ২: যাকারিয়া (আ.) — সন্তান যেন নেক ও পবিত্র হয়
যাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সে সন্তান চেয়েছিলেন। কিন্তু শুধু সন্তান চাননি — "তাইয়্যিব" সন্তান চেয়েছেন।
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
উচ্চারণ: রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা যুররিইয়্যাতান তাইয়্যিবাতান ইন্নাকা সামিউদ দুআ।
"হে আমার রব, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।"
(সূরা আলে ইমরান: ৩৮)
"তাইয়্যিবাতান" — পবিত্র, পরিচ্ছন্ন, ভালো। শুধু চেহারায় সুন্দর না — চরিত্রে সুন্দর। শুধু স্বাস্থ্যে ভালো না — ঈমানে ভালো।
কখন পড়বেন? যখন সন্তান চান — হালাল, পবিত্র, নেক সন্তান। গর্ভে সন্তান থাকলে তখন থেকেই শুরু করুন। আর সন্তান বড় হওয়ার পরও পড়তে থাকুন।
---
দোয়া ৩: নুহ (আ.) — সন্তান ও পরিবারকে ক্ষমা চাওয়া
নুহ (আ.)-এর একটা ছেলে ঈমান আনেনি। নৌকায় ওঠেনি। ডুবে গেছে। এই কষ্ট বুকে নিয়েও তিনি বাকি পরিবারের জন্য দোয়া ছাড়েননি —
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলি ওয়ালিওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিমান দাখালা বাইতিয়া মুমিনান ওয়ালিল মুমিনীনা ওয়াল মুমিনাত।
"হে আমার রব, আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমার ঘরে যে মুমিন হয়ে প্রবেশ করে তাকে এবং সকল মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন।" (সূরা নুহ: ২৮)
দোয়ার দরজা যত বড় করবেন — আল্লাহ তত বেশি দেবেন।
কখন পড়বেন? প্রতিদিন। প্রতি নামাজের পর। আর যদি সন্তান দ্বীন থেকে দূরে থাকে — নুহ (আ.)-এর কষ্ট মনে করুন। তাঁর ছেলে ঈমান আনেনি — তারপরও দোয়া ছাড়েননি। আপনিও ছাড়বেন না।
---
দোয়া ৪: লুকমান (আ.) — সন্তানকে বোঝানোর ভাষা
লুকমান(আ.) সরাসরি দোয়ার ভাষায় চাননি — বরং সন্তানকে এমনভাবে বলেছেন যা নিজেই দোয়া হয়ে গেছে।
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ
উচ্চারণ: ইয়া বুনাইয়্যা আকিমিস সালাতা ওয়ামুর বিলমারুফি ওয়ানহা আনিল মুনকারি ওয়াসবির আলা মা আসাবাক।
"হে আমার প্রিয় সন্তান, নামাজ কায়েম করো, ভালো কাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো, আর তোমার ওপর যা আসে তাতে ধৈর্য ধরো।" (সূরা লুকমান: ১৭)
"ইয়া বুনাইয়্যা" — এত ভালোবাসা এই সম্বোধনে! রাগ নেই, চিৎকার নেই — শুধু ভালোবাসা।
কখন ব্যবহার করবেন? সন্তানকে কিছু শেখাতে চাইলে রাগ না করে "বাবু/মা, শোনো..." বলে শুরু করুন। ভালোবাসা দিয়ে বললে সন্তান শোনে। রাগ দিয়ে বললে দূরে যায়।
---
দোয়া ৫: আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) — মা-বাবা হিসেবে ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া
আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) ভুল করেছিলেন। ভুল বুঝতে পেরে বলেছিলেন —
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরীন।
"হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।" (সূরা আরাফ: ২৩)
কেন সন্তান-সম্পর্কিত দোয়ার তালিকায়? কারণ মা-বাবা হিসেবে আমরাও ভুল করি। রাগ করে কঠিন কথা বলি। তুলনা করি। অবহেলা করি। আমরা পারফেক্ট না — ভুল হলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়।
কখন পড়বেন? সন্তানের ওপর রাগ করে ফেললে, বেশি বকে দিলে — রাতে সেজদায় গিয়ে এই দোয়া পড়ুন।
---
৫টা দোয়া — এক নজরে
ইবরাহীম (আ.) — সন্তান নামাজী হোক: "রাব্বিজআলনি মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিইয়্যাতি"
যাকারিয়া (আ.) — সন্তান পবিত্র ও নেক হোক: "রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা যুররিইয়্যাতান তাইয়্যিবাতান"
নুহ (আ.) — সন্তান ও পরিবার ক্ষমা পাক: "রাব্বিগফিরলি ওয়ালিওয়ালিদাইয়্যা..."
লুকমান (আ.) — সন্তানকে ভালোবাসায় শেখান: "ইয়া বুনাইয়্যা আকিমিস সালাহ..."
আদম (আ.) — নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চান: "রাব্বানা যালামনা আনফুসানা..."
আজ রাতে সন্তানের মাথায় হাত রাখুন। ৫টার যেকোনো একটা পড়ুন। কাঁদুন। আল্লাহর কাছে চান।
কারণ মা-বাবার দোয়া আল্লাহ ফেরান না। নবীজি ﷺ বলেছেন — ৩ ধরনের দোয়া আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই — তার মধ্যে একটা হলো সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া। (জামে তিরমিযী: ১৯০৫)
---
মনে রাখবেন!
আপনি সন্তানকে সবচেয়ে দামি স্কুলে পড়াতে পারেন — কিন্তু হেদায়াত দিতে পারেন না। সবচেয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারেন — কিন্তু তাকদীর বদলাতে পারেন না। সবচেয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন — কিন্তু গ্যারান্টি দিতে পারেন না।
শুধু একটা কাজ আছে যা সত্যিই সন্তানের জীবন বদলে দিতে পারে — দোয়া।
নবীরাও সন্তানের জন্য দোয়া করেছেন। তাঁরা নবী ছিলেন — তারপরও আল্লাহর কাছে চেয়েছেন। কারণ তাঁরা জানতেন — হেদায়াত শুধু আল্লাহর হাতে।
আজ রাত থেকে শুরু করুন। ৫টা দোয়ার একটা বেছে নিন। প্রতিদিন পড়ুন। সন্তানের নাম ধরে চান। কাঁদুন। আল্লাহ শুনছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার সন্তানকে নামাজী বানান, নেক বানান, পবিত্র রাখুন, ক্ষমা করুন, আর আমাদের প্যারেন্টিংয়ের ভুলগুলো মাফ করুন। আমিন।
এই ৫টা দোয়ার মধ্যে কোনটা আপনার সবচেয়ে বেশি দরকার?
রেফারেন্স:
— সূরা ইবরাহীম: ৪০
— সূরা আলে ইমরান: ৩৮
— সূরা নুহ: ২৮
— সূরা লুকমান: ১৭
— সূরা আরাফ: ২৩
— জামে তিরমিযী: ১৯০৫
— তাফসীরে ইবনে কাসীর
/EKRAMHOSSAIN
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন