তাসবিহ নাকি ইসতিগফার: কোনটি বেশি উপকারী?

 

তাসবিহ নাকি ইসতিগফার: কোনটি বেশি উপকারী?
ইবনুল কাইয়েম (রাহ.) বলেন: আমি একদিন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জনৈক আলেমকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, একজন বান্দার জন্য তাসবিহ (আল্লাহর মহিমা ঘোষণা) নাকি ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)-কোনটি বেশি উপকারী?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন:
 "إِذَا كَانَ الثَّوْبُ نَقِيًّا؛ فَالْبَخُورُ وَمَاءُ الْوَرْدِ أَنْفَعُ لَهُ، وَإِذَا كَانَ دَنِسًا؛ فَالصَّابُونُ وَالْمَاءُ الْحَارُّ أَنْفَعُ لَهُ
 “কাপড় যদি পরিষ্কার থাকে তবে তাতে ধূপ (সুগন্ধি) ও গোলাপজল ছিটানোই বেশি উপকারী। আর যদি তা নোংরা থাকে তবে সাবান ও গরম পানি ব্যবহার করাই বেশি উপকারী।”
অতঃপর শাইখুল ইসলাম বললেন: 
فَكَيْفَ وَالثِّيَابُ لَا تَزَالُ دَنِسَةً؟
'তাহলে আমাদের অবস্থা ভেবে দেখো, যেখানে আমাদের (গুনাহের) কাপড় তো সবসময়ই নোংরা হয়ে থাকে!'" [আল ওয়াবিল আস সাইয়েব: পৃষ্ঠা নং ১২২]
অর্থাৎ আমাদের অন্তর ও আমলের অবস্থা অনেকটা কাপড়ের মতো। যখন বান্দা গুনাহ মুক্ত থেকে বা বান্দার গুনাহ কম থাকে তখন তখন আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ তার মর্যাদা বৃদ্ধিতে সুগন্ধির মতো কাজ করে। কিন্তু বান্দার জীবন যখন পাপ-পঙ্গিলতায় পূর্ণ থাকে, সে প্রচুর গুনাহ করে তখন জিকির ও তাসবিহ-এর তুলনায় ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) জীবনকে পাপ মুক্ত করার জন্য সাবান ও গরম পানির মত কাজ করে। অর্থাৎ তখন বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ার মাধ্যমে পাপ মুক্ত হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কথায় কোনও সন্দেহ নাই যে, মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ছোট-বড় নানা গুনাহে লিপ্ত হই। এই অবস্থায় আমাদের অন্তরকে কালিমা মুক্ত করার জন্য 'সাবান ও গরম পানি' অর্থাৎ ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব বেশি। আর তাই তো রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)দিনে ও রাতে ৭০ বা ১০০ বার ইস্তিগফার পাঠ করতেন।
❑ তাসবিহ ও ইস্তিগফার উভয়টির মধ্যে সমন্বয় থাকা কর্তব্য:
পূর্বোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে কখনো জিকির ও তাসবিহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ আবার কখনো ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর শিক্ষা হল, জিকির ও তাসবিহ এবং ইস্তিগফারের মধ্যে সমন্বয় করা। কারণ প্রকৃতপক্ষে জিকির-তাসবিহ এবং ইস্তিগফার উভয়টাই বান্দার গুনাহ মোচন করে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে। (এমন নয় যে, জিকির কেবল মর্যাদা বৃদ্ধি করে আর ইস্তিগফার কেবল গুনাহ মোচন করে)।  তাই আমাদের উচিৎ উভয়টির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
✪ ইমাম বুখারি রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ" 
"যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' (আমি আল্লাহর প্রশংসা সহকারে পবিত্রতা ঘোষণা করছি) বলবে তার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেওয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো বিশাল হয়।" [সহীহ বুখারী: ৬৪০৫]
✪ আল আগার আল মুজানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
«إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَىٰ قَلْبِي، وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ»
"নিশ্চয়ই আমার অন্তরে কিছুটা আবরণ বা মেঘের ছায়ার মতো অনুভব হয়, তাই আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে একশত বার ক্ষমা প্রার্থনা (ইসতিগফার) করি।" [সহিহ মুসলিম: ২৭০২]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও সার্বক্ষণিক আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই উচ্চ মর্যাদা সত্ত্বেও তিনি অনুভব করতেন যে, জিকির বা ইবাদতে সামান্যতম বিরতিও যেন তাঁর হৃদয়ে এক ধরণের আবরণের সৃষ্টি করছে। সেই সামান্য আবরণটুকু পরিষ্কার করার জন্য তিনি দিনে ১০০ বার ইসতিগফার করতেন। তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য ইস্তিগফারের প্রয়োজনীয়তা কত বেশি তা সহজেই অনুমেয়।
✪ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,
«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكْثِرُ مِنْ قَوْلِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ»
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক হারে এই দোয়াটি পাঠ করতেন: 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আসতাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি' (অর্থাৎ: আল্লাহর প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসছি)।" [সহিহ বুখারি: ৪৮১৭, সহিহ মুসলিম: ৪৮৪]
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) এবং ইসতিগফার(আসতাগফিরুল্লাহ)—এই দুটির সমন্বয়ই হল নববী আদর্শ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিকে তাসিবহ তথা আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করতেন আবার সাথে সাথেই ইস্তিগফার তথা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এটিই সেই 'সাবান-গরম পানি' এবং 'সুগন্ধি'র অনন্য সমন্বয়, যা মুমিনের অন্তরকে পবিত্র ও সুশোভিত রাখে এবং আল্লাহর দরবারে তা মর্যাদাকে উন্নীত করে। আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে: 
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল 
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন