কীভাবে ইরান সুন্নি রাষ্ট্র থেকে শিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হলো

 **উম্মাহর দুর্বলতা ও বিভাজনের শুরু এখান থেকেই – সেই অভিশপ্ত শিয়া সাফাভির শাসন থেকে


কীভাবে ইরান সুন্নি রাষ্ট্র থেকে শিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হলো ইসমাইল সাফাভির যুগে**


ইরান প্রায় নয়শ বছর ধরে মুসলিম সুন্নি শাসনের অধীনে ছিল— খলীফা উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর যুগে বিজয়ের পর থেকে উমাইয়া ও আব্বাসীয় খিলাফতের ধারাবাহিকতায়।


দেশটি দীর্ঘদিন আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ মতবাদের ওপর অটল ছিল— যতক্ষণ না শিয়া সাফাভি রাষ্ট্র আবির্ভূত হয়ে ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেয় এবং দেশব্যাপী শিয়াপন্থাকে রাষ্ট্রীয় মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।


ইসমাইল সাফাভি আধুনিক সাফাভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বংশধারা পৌঁছায় সপ্তম হিজরী শতাব্দীর এক বিখ্যাত সুফি শায়খ— সাফিউদ্দীন আল-আরদাবিলীর কাছে, যিনি আজারবাইজান ও উত্তর ইরান জুড়ে বিস্তৃত একটি সুফি তরিকার ভিত্তি গড়েছিলেন।


পিতার মৃত্যুর পর ইসমাইল সাফাভি সেই তরিকার অনুসারীদের ঘিরে বড় হন। তিনি মূলত ‘কিজিলবাশ’ যোদ্ধাদের ওপর নির্ভর করতেন— যারা তাঁর সামরিক শক্তির মূলভিত্তি ছিল। মাত্র পনের বছর বয়সে, ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাবরিযে প্রবেশ করে নিজেকে ইরানের শাহ ঘোষণা করেন— এবং দেশটির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।


সে সময়ে ইরানের অধিকাংশ অঞ্চল ছিল সুন্নি। তাই ইসমাইলের এ প্রকল্প তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে।


ঐতিহাসিক সূত্রগুলো উল্লেখ করে— বহু শহরে, যেমন তাবরিযে, জনগণকে জোরপূর্বক মত পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়।


ইতিহাসে বলা হয়, এই রূপান্তর মোটেও সহজ ছিল না— বরং নানা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, যার গভীর প্রভাব ইরানি সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বজায় রয়েছে।


সাফাভি রাষ্ট্রের সূচনালগ্নেই ব্যাপক মাযহাবী ও রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দেয়। ‘আহসান-উত-তাওয়ারিখ’–এর মতো ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে— বিভিন্ন অঞ্চলে জোরপূর্বক শিয়াপন্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।


এই সময়কাল অঞ্চলটির ইতিহাসে সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর একটি, যা ইরানের ধর্মীয় কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়।


অসংখ্য সুন্নি আলেম এই ধর্মীয় রূপান্তরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন— অনেক আলেম নিপীড়নের শিকার হন এবং বেশ কিছু শহর নিজেদের বহু আলেমকে এ অস্থিরতার মধ্যে হারায়, তাদেরকে সাফাভীরা হত্যা করে।


সমসাময়িক সূত্রগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী— এসব নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ধর্মীয় পরিচয়কে ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা।


ইরানে ক্ষমতা সুদৃঢ় করার পর ইসমাইল সাফাভি নজর দেন ইরাকের দিকে— যা তখন রাজনৈতিক দুর্বলতায় ভুগছিল।


১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে সাফাভিরা বাগদাদে প্রবেশ করে, এবং ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়— যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে বাগদাদ, মসুল, দিয়ালা–সহ পুরো অঞ্চলের ধর্মীয় চিত্রে।


সাফাভিদের নির্মিত ধর্মীয় স্থাপনা আজও ইরাকের ভূগোলে দৃশ্যমান।


অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে সংঘর্ষ


সুলতান সেলিম ছিলেন এমন একজন দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব যিনি প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন— সাফাভিদের সম্প্রসারণ মুসলিম বিশ্বের শক্তির ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি।


ফলে ১৫১৪ সালে ঘটে ঐতিহাসিক চালদিরান যুদ্ধ— যা সাফাভিদের পরাজয়ে শেষ হয়, যদিও তাদের রাষ্ট্র ধ্বংস হয়নি।


অটোমান–সাফাভি সংঘর্ষ আরও বহু দশক ধরে চলতে থাকে এবং ইউরোপীয় শক্তির উত্থানের মুখে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যকে দুর্বল করে দেয়।


 মুসলিম বিশ্বের ওপর সাফাভি রূপান্তরের প্রভাব


সাফাভি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনীতি ও মাজহাবি মানচিত্রে বিশাল পরিবর্তন আসে।


ইরান ধীরে ধীরে শিয়াপন্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের সুন্নি অঞ্চলগুলোর মাঝে এক ভৌগোলিক–রাজনৈতিক দেয়ালে পরিণত হয়— যা মুসলিম ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।


ফরাসি প্রাচ্যবিদ রিনো বলেন:


“সাফাভি রাষ্ট্র না হলে হয়তো ইসলামের প্রভাব ইউরোপে আজকের চেয়ে আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত।”


উৎসসমূহ


 ১- আদ দাওলাহ আস সাফাউইয়্যাহ ফী ঈরান– রবার্ট কানে।


২- ইরান বাইনাত তাসান্নুন ওয়াত তাশাইয়্যু' - ইহসান ইলহী জহির। 


৩- আহসানুত তাওয়ারীখ, মুহাম্মাদ কাজিম আল মারওয়ী। 


৪- আস-সিরা' বাইনাস সুন্নী আশ শিয়ী ফিত তারীখ, মামদূহ হাক্কী


৫- তারীখুদ দাউলাহ আল উসমানিয়্যাহ, ইয়ালমায ওজতুনা। 


৬- আদ-দাওলাতুস সাফাউইয়্যাহ: নাশআতুহা ওয়া তাত্তাওয়্যুরুহা, আব্দুল আযীয আব্দুল গনী ইবরাহিম।


✍️ Abubakar Muhammad Zakaria (Hafizahullah)

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন