বিদ’আতের ভয়াবহতা: [১৫টি পয়েন্ট]

 

বিদ’আতের ভয়াবহতা: [১৫টি পয়েন্ট]

দ্বীনের মধ্যে বিদআতের পরিণতি অতিভয়ঙ্কর। বিদআত দ্বীনকে ধ্বংস করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা। তাই এ বিষয়ে সচেতন থাকা প্রত্যেক ইমানাদারের জন্য আবশ্যক।

এখানে বিদআতের ভয়াবহতা বিষয়ে ১৫ টি পয়েন্ট [হাদিস ও সাহাবী-তাবেঈদের উক্তি] উল্লেখ করা হল:

১. বিদআতীর আমল আল্লাহর কাছে অগ্রাহ্যঃ

আয়েশা [রাঃ] থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করল যা দ্বীনে নেই সে কাজটি আল্লাহর কাছে পরিত্যজ্য।”                            [বুখারী ও মুসলিম]

অন্য হাদিসে এসেছে: আয়েশা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’                                                                                  [বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০]

ফুযাইল ইবনু আয়ায [রহ.] বলেন, যখন তোমরা বিদআতপন্থী কোন লোক আসতে দেখবে সে রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা গ্রহণ করবে। বিদআতীর কোন আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি বিদআতপন্থীকে সহযোগিতা করল সে যেন দ্বীন ধ্বংস করতে সহযোগিতা করল।                                [খাছায়িছূ আহলিস সুন্নাহ]

২. বিদআতীর তওবা গ্রহনযোগ্য হবে না যতক্ষণ না সে বিদআত সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয়ঃ

আনাস ইবনু মালেক [রাঃ] বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেন, “আল্লাহ তাআলা বিদআতীদের থেকে তওবাকে আড়াল করে রাখেন যতক্ষণ না সে বিদআত পরিত্যাগ করেন।”                                                                                  [তবরানী, সহিহ তারগিব/৫৪, সনদ হাসান]

৩. কিয়ামতের দিন বিদআতি হাওযে কাউসারের পানি থেকে বঞ্চিত হবেঃ

রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] কিয়ামতের দিন বিদআতী লোকদের থেকে বেশী অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন। সাহাল ইবনু সাআদ [রাঃ] বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন “আমি হাওযে কাওসারে তোমাদের অপেক্ষায় থাকব। যে ব্যক্তি সেখানে আসবে সে পানি পান করবে। আর যে ব্যক্তি একবার পানি পান করবে তার কখনো তৃষ্ণা থাকবে না। কিছু লোক এমন আসবে যাদেরকে আমি চিনব। তারাও আমাকে চিনবে। আমি মনে করব তারা আমার উম্মত তার পরও তাদেরকে আমার নিকট পর্যন্ত পৌঁছতে দেয়া হবে না। আমি বলব এরা তো আমার উম্মত। আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না আপনি দুনিয়া থেকে চলে আসার পর এসব লোকেরা কেমন কেমন বিদআত সৃষ্টি করেছে।

 

তার পর আমি বলব, “দূর হোক, দূর হোক সে সকল লোক যারা আমার পর দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করেছে।                                                                                            [বুখারী ও মুসলিম]

৪. বিদআত সৃষ্টিকারীর প্রতি আল্লাহ, তার ফেরেশতা মণ্ডলী এবং সব মানুষের অভিশাপ বর্ষিত হয়:

রাসূলুল্লাহ্ [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেন: মদীনা হারাম [সম্মানার্থে] আইর হতে সওর পর্যন্ত। যে তাতে কোন বিদ‘আত সৃষ্টি করবে অথবা বিদ‘আত সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দিবে, তার উপর আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ এবং মানুষ সকলেরই অভিসম্পাত। তার ফরয বা নফল কিছুই কবুল করা হবে না।”                                                           [মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৭২৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/২৬০৮]

৫. বিদআতীকে সহযোগিতাকারীর উপর আল্লাহর অভিশাপঃ

আলী [রাঃ] হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন, “আল্লাহ অভিশাপ করেছেন সেই ব্যক্তিকে যে আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো নামে জন্তু জবেহ করে। আর যে জমির সীমা চুরি করে। আর যে মাতা পিতাকে অভিশাপ দেয়। আর যে বিদআতীকে আশ্রয় দেয়।                              [মুসলিম]

৬. বিদআত থেকে যে কোন উপায়ে বাঁচার আদেশ রয়েছেঃ

ইরবায ইবনু সারিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন, “তোমরা দ্বীনের মধ্যে নিত্য-নতুন আবিষ্কার [বিদআত] থেকে বাঁচো।“              [আবু দাউদ, সহিহ। কিতাবুস সুন্নাহ ইবনু আবী আসিম]

৭. নিকৃষ্টতম কাজ হ’ল দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি করা [বিদআত তৈরি করা]:

জাবের [রাঃ] থেকে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] হামদ ও ছালাতের পর বলেন, ‘নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ বাণী হ’ল আল্লাহর কিতাব এবং শ্রেষ্ঠ হেদায়াত হ’ল মুহাম্মাদের হেদায়াত। আর নিকৃষ্টতম কাজ হ’ল দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি এবং প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই হ’ল ভ্রষ্টতা’                            [মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১]

আর নাসাঈতে রয়েছে, ‘প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম’                       [নাসাঈ হা/১৫৭৮]

৮. বিদআত প্রচলনকারী নিজের গুনাহ ব্যতিত তার সৃষ্ট বিদআত মতে আমলকারী সব লোকের গুনাহের একটি ভাগ পাবেঃ

কাসীর ইবনু আব্দুল্লাহ রহঃ বলেন রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, আবু হুরায়রা [রাঃ] থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে সৎ পথের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য সেই পরিমাণ ছওয়াব রয়েছে, যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে। অথচ এতে তাদের নিজস্ব ছওয়াবে কোনরূপ কমতি হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কাউকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করে, তার জন্যও ঠিক সেই পরিমাণ গোনাহ রয়েছে, যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে। অথচ তাদের নিজস্ব গোনাহে কোনরূপ কমতি হবে না’                                                                                      [মুসলিম, মিশকাত হা/১৫৮]

 

৯. ‘বিদআতি কাজে কষ্ট-পরিশ্রম করার চেয়ে মধ্যম পন্থায় সুন্নাতের উপর আমল করা অতীব উত্তম:

ইবনু মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিতঃ “বিদআতি কাজে কষ্ট-পরিশ্রম করার চেয়ে মধ্যম পন্থায় সুন্নাতের উপর আমল করা অতীব উত্তম।”                                                                   [আত-তারগীব হা/৬৩-সহিহ]

১০. বিদআত ফিতনায় পতিত হওয়া বা কষ্ট দায়ক শাস্তিযোগ্য হওয়ার বড় কারণঃ

ইমাম মালেক রাহঃ কে জিজ্ঞাসা করা হল, হে আবু আব্দল্লাহ! ইহরাম কোথা থেকে বাঁধব? আমি মসজিদে নববী তথা কবর শরীফের কাছ থেকে ইহরাম বাঁধতে চাই।

 

উত্তরে ইমাম মালেক বললেন: এরূপ কর না। আমার ভয় হয়, হয়ত তুমি ফিতনায় পতিত হবে। লোকটি বলল, এখানে ফিতনার কী আছে? আমি তো শুধু কয়েক মাইল পূর্বে ইহরাম বাঁধতে চাইছি। ইমাম মালেক বললেন: এর চেয়ে বড় ফিতনা আর কি হবে যে, তুমি মনে করছ যে ইহরাম বাঁধার ছওয়াব রাসূল [সাঃ] থেকে আগে বেড়ে যাচ্ছ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা আল্লাহ তায়ালার আদেশ অমান্য করে তাদের ভয় থাকা উচিৎ যেন তারা কোন ফিতনা বা কষ্ট দায়ক শাস্তিতে পতিত না হয়।             [আল ইতিসাম]

১১. বিদআত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের কে সুন্নাহ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়ঃ

হাসসান বিন আত্বিয়াহ মুহারেবী [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ “যখনই কোন সম্প্রদায় তাদের দ্বীনের মধ্যে কোন বিদ‘আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তাদের মধ্য হতে সেই পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। অতঃপর ক্বিয়ামত অবধি তা আর তাদের মধ্যে ফিরে আসে না।”                                    [দারেমী, মিশকাত হা/১৮৮-সহিহ]

১২. অন্য গুনাহের চেয়ে বিদআত শয়তানের কাছে অধিক প্রিয়ঃ

সুফিয়ান ছাওরী [রহঃ] বলেন: শয়তান পাপের পরিবর্তে বিদআতকে বেশি পছন্দ করে। কারণ পাপ থেকে তো লোকেরা তওবা করে নেয় কিন্তু বিদআত থেকে তওবা করে না।

[শরহুস সুন্নাহ, আত তুহফাতুল ইরাকিয়া ফিল আমাল আল কালবিয়া, পৃষ্ঠা ১২]

১৩. বিদআতিকে সহযোগিতা করা ইসলাম ধ্বংসে সহযোগিতা করার শামিল:

ফুযাইল ইবনে ইয়ায রাহ, বলেন: “যে ব্যক্তি বিদআতপন্থীকে সহযোগিতা করল সে যেন দ্বীন ধ্বংস করতে সহযোগিতা করল।”                                                                 [খাছায়িছূ আহলিস সুন্নাহ]

১৪. আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাঃ বিদআতীদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছেনঃ

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ [রাঃ] জানতে পারলেন যে, কিছু লোক মসজিদে একত্রিত হয়ে উচ্চস্বরে যিকির এবং দরুদ শরীফ পড়তে ছিলেন। তিনি তাদের কাছে আসলেন এবং বললেন, আমরা রাসূল [সাঃ] এর যামানায় এরূপভাবে যিকির করতে বা দুরূদ পড়তে কাউকে দেখিনি। অতএব আমি তোমাদেরকে বিদআতী মনে করি। তিনি এ কথাটি বারবার বলেছিলেন, এমনকি তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিলেন।                                                                                                         [আবূ নুআইম]

১৫. মুহাদ্দিসগণের নিকট বিদআতীদের হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়ঃ

মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন [রহ] বলেন, প্রথম প্রথম লোকেরা হাদীসের সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না কিন্তু যখন ফিতনা, বিদআত ও মন গড়া বর্ণনা প্রসার হতে লাগল তখন হাদীসের সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা অপরিহার্য হয়ে গেল। যদি হাদীস বর্ণনাকারী আহলে সুন্নাহ হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা হয় আর যদি বর্ণনাকারী বিদআতপন্থি হয় তাহলে তার হাদীস গ্রহণ করা হয় না।                                     [মুসলিম]

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন