সিয়াম/রোযা সংক্রান্ত

 

সিয়াম/রোযা সংক্রান্ত

§  আবূ হুরায়রা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেনঃ আল্লাহ্‌র মর্জি হলে আদম সন্তানের প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। আল্লাহ্‌ বলেন, তবে সিয়াম ব্যতীত, তা আমার জন্যই [রাখা হয়] এবং আমিই তার প্রতিদান দিবো। সে তার প্রবৃত্তি ও পানাহার আমার জন্যই ত্যাগ করে। রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দঃ একটি আনন্দ তার ইফতারের সময় এবং আরেকটি আনন্দ রয়েছে তার প্রভু আল্লাহ্‌র সাথে তার সাক্ষাতের সময়। রোযাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধ আল্লাহ্‌র নিকট কস্তুরীর ঘ্রাণের চেয়েও অধিক সুগন্ধময়।

[বুখারী ১৮৯৪, ১৯০৪, মুসলিম ১১৫১, তিরমিজি ৭৬৪, নাসাঈ ২২১৪, ৬৬১৬, ২২১৭, ২২১৮, ২২১৯, ৭১৩৪, ৭১৫৪, ৭৫৫২, ৭৬৩৬, ৭৭৩০, ৮৮৬৮, ৮৮৯৩, ৯০২২, ৯০৬৭, ৯০৯৯, ৯৪২১, ২৭২৫৫, ২৭২৭১, ৯৮১৯, ৯৯১৮, ১০১২৭, ১০১৭৬, ১০৩১৩, মুয়াত্তা মালেক ৬৯০, দারেমী ১৭৬৯, ১৭৭০ সহীহ্ তারগীব, ৯৬৮, সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৩৮]

 

সিয়ামের ফযীলত:

§  রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন হ’তে ৭০ বছরের পথ দূরে রাখবেন’। অন্য বর্ণনায় ১০০ বছরের পথ দূরে রাখবেন বলা হয়েছে।                                              [সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬৭, ২৫৬৫]

§  সাহ্‌ল বিন সা’দ [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, জান্নাতের একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। কিয়ামাতের দিন সেখান থেকে আহ্বান করা হবেঃ রোযাদারগণ কোথায়? যে ব্যক্তি রোযাদার হবে, সে উক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং যে উক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সে কখনও পিপাসার্ত হবে না।

[সহীহুল বুখারী ১৮৯৬, ৩২৫৭, মুসলিম ১১৫২, তিরমিজি ৭৬৫, নাসাঈ ২২৩৬, ২২৩৭, আহমাদ ২২৩১১, ২২৩৩৫ সহীহ তারগীব ৯৬৯, সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪০]

 

§  আবূ হুরায়রা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] আমাকে তিনটি বিষয়ের অসিয়ত করেছেন। যতদিন জীবিত থাকবো আমি সেগুলো কখনোও ত্যাগ করব না। সেগুলো হচ্ছে, প্রতিমাসে তিন দিন রোযা রাখা, চাশ্‌তের নামায পড়া এবং বিতর পড়ে ঘুমানো।’

[বুখারী ১১৭৮, ১৯৮১, মুসলিম ৭২১, তিরমিজি ৭৬০, নাসাঈ ১৬৭৭, ১৬৭৮, ২৪০৬, আবূ দাউদ ১৪৩২, আহমাদ ৭০৫৮, ৭১৪০, ৭৪০৯, ৭৪৬০, ৭৪৮৩, ৭৫৪১, ৭৬১৫, ৮০৪৪, ৯৬০০, ৯৯০৩, ১০১০৫, দারেমী ১৪৫৪, ১৭৪৫, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬৬]

§  উসমান [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ [সাঃ]-কে বলতে শুনেছিঃ যুদ্ধের মাঠে ঢাল যেমন তোমাদের রক্ষাকারী, সিয়ামও তদ্রূপ জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল।

[নাসাঈ ২২৩০, ২২৩১, আহমাদ ১৫৮৩৯, ১৫৮৪৪, ১৭৪৪৫, সহীহ তারগীব ৯৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৬৩৯]

 

১. মুহাররম মাসের সিয়ামঃ

আবূ হুরাইরা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, “মাহে রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা, আল্লাহর মাস মুহাররম। আর ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায রাতের [তাহাজ্জুদ] নামায।”

[মুসলিম ১১৬৩, তিরমিজি ৪৩৮, ৭৪০, আবূ দাউদ ২৪২৯, ইবনু মাজাহ ১৭৪২, আহমাদ ৭৯৬৬, ৮১৫৮, ৮৩০২, ৮৩২৯, ১০৫৩২, দারেমী ১৭৫৭, ১৭৫৮, রিয়াদুস সলেহীন ১২৫৪]

 

আশূরার সিয়াম তথা মুহাররমের ১০ তারিখের সিয়ামও অধিক ফযীলতপূর্ণ। ইহুদীরাও এইদিন সিয়াম পালন করত। ফেরাঊনের কবল থেকে মূসা [আঃ]-এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ এ সিয়াম রাখা হয়। কারবালার প্রান্তরে হুসাইন [রাঃ]-এর শাহাদতকে কেন্দ্র করে এ সিয়াম পালন করলে শুধু কষ্ট করাই সার হবে। কারণ তার অর্ধ শতাব্দী পূর্বেই ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস [রাঃ] হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ [সাঃ] মদীনায় এসে ইহুদীদেরকে আশূরার সিয়াম পালন করতে দেখে এর কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, ‘এই দিন উত্তম দিন। এই দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে মুক্তি দান করেছিলেন, ফলে মূসা [আঃ] এই দিনে সিয়াম পালন করেছেন’। রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বললেন, ‘আমি তোমাদের চেয়ে মূসা [আঃ]-এর [আদর্শের] অধিক হক্বদার। অতঃপর তিনি এ দিনে সিয়াম পালন করেন এবং সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন’।                                                           [বুখারী হা/২০০৪]

 

রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, “আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে মুহাররম মাসের নবম তারিখে অবশ্যই রোযা রাখব।” [অর্থাৎ, নবম ও দশম দু’দিন ব্যাপী রোযা রাখব।]

[মুসলিম ১১৩৪, আবূ দাউদ ২৪৪৫, আহমাদ ২১০৭, ২৬৩৯, ২৮২৭, ২১০২, ৩১৫৪, দারেমী ১৭৫৯, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬১]

 

ইবনু আববাস [রাঃ] বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ [সাঃ]-কে আশূরার সিয়ামের ন্যায় অন্য কোন সিয়ামকে এবং এই মাস অর্থাৎ রামাযান মাসের ন্যায় অন্য কোন মাসকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি’।              [বুখারী হা/২০০৬]

 

২য় হিজরী সনে রামাযান মাসের সিয়াম ফরয করা হলে রাসূল [সাঃ] এই নির্দেশ শিথিল করে দেন। আয়েশা [রাঃ] বলেন, আল্লাহর রাসূল [সাঃ] প্রথমে আশূরার সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। পরে যখন রামাযান মাসের সিয়াম ফরয করা হয় তখন আশূরার সিয়াম ছেড়ে দেয়া হ’ল। যার ইচ্ছা সে পালন করত, যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দিত।                                                                 [বুখারী হা/২০০২, ২/৩৭৬ পৃঃ]

 

রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘তোমরা আশূরার সিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের বিপরীত কর। তোমরা আশূরার সাথে তার পূর্বে একদিন অথবা পরে একদিন সিয়াম পালন কর’। [বায়হাক্বী ৪/২৮৭ পৃঃ] সুতরাং আশূরার সিয়াম মুহাররমের ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে রাখা যায়। তবে ৯, ১০ তারিখে রাখাই সর্বোত্তম।                     

[আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয় [হা.ফা.বা.], পৃঃ ৩, টীকা-৮ দ্রঃ]

 

এ সিয়ামের ফযীলত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘আশূরার সিয়াম সম্পর্কে আমি আল্লাহর নিকটে আশা রাখি যে, উহা বিগত এক বছরের পাপ মোচন করে দিবে’।                [মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৪৬, ৪/২৫১]

 

ইবনে আব্বাস [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] আশূরার [মুহার্‌রাম মাসের দশম] দিনে স্বয়ং রোযা রেখেছেন এবং ঐ দিনে রোযা রাখতে আদেশ করেছেন।

[সহীহুল বুখারী ২০০৪, ৩৩৯৭, ৩৯৪৩, ৪৬৮০, ৪৭৩৭, মুসলিম ১১৩০, আবূ দাউদ ২৪৪৪, ইবনু মাজাহ ১৭৩৪, আহমাদ ১৯৭২, ২১০৭, ২১৫৫, ২৬৩৯, ২৮২৭, ৩১০২, ৩১৫৪, ৩২০৩, দারেমী ১৭৫৯, রিয়াদুস সলেহীন ১২৫৯]

 

আবূ ক্বাতাদাহ [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [(সাঃ)] বলেন, “মুহার্‌রাম মাসের রোযা রাখলে আল্লাহ্‌র নিকট আশা করি যে তিনি বিগত এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।”                                                                     [মুসলিম ১১৬২, আহমাদ ২২০২৪, ২২১১৫, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬০]

 

২. শা‘বান মাসের সিয়াম:

উম্মু সালামাহ [রাঃ] হতে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ [সাঃ] শা‘বান মাসে সিয়াম রাখতে রাখতে রমাদানে পৌঁছতেন।

[সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৮, তিরমিজি ৭৩৬, নাসাঈ ২১৭৫, ২১৭৬, ২৩৫২, ২৩৫৩, আবূ দাউদ ২৩৩৬, আহমাদ ২৬০২২, ২৬১১৩, দারেমী ১৭৩৯ সহীহ আবী দাউদ ২০২৪]

রাসূলুল্লাহ [সাঃ] রামাযানের ফরয সিয়ামের পর শা‘বান মাসেই একটানা নফল সিয়াম পালন করতেন। আয়েশা [রাঃ] বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ [সাঃ]-কে রামাযান মাস ব্যতীত অন্য কোন মাসে পুরো মাস সিয়াম রাখতে দেখিনি। আর শা‘বান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে এত অধিক সিয়াম রাখতে দেখিনি’।

[সহীহুল বুখারী ৪৩, ১১৩২, ১১৫১, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৮৭, ৬৪৬১, ৬৪৬২, ৬৪৬৪-৬৪৬৭, মুসলিম ৭৪১, ৭৮২, ৭৮৩, ৭৮৫, ১২৫৬, ৭৮২, ১৮১৮, নাসাঈ ৭৬২, ১৬১৬, ১৬৪২, ১৬৫২, ২১৭৭, ২৩৪৭, ২৩৪৯, ২৩৫১, ৫০৩৫, আবূ দাউদ ১৩১৭, ১৩৬৮, ১৩৭০, ২৪৩৪, ইবনু মাজাহ ১৭১০, ৪২৩৮, আহমাদ ২৩৫২৩, ২৩৬০৪, ২৩৬৪২, ২৩৬০৪, ২৩৬৬৯, ২৪০১৯, ২৪১০৭, মুওয়াত্তা মালিক ৪২২, ৬৮৮, রিয়াদুস সলেহীন ১২৫৫]

 

তিনি আরো বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ [সাঃ] শা‘বান মাসের চেয়ে অধিক সিয়াম কোন মাসে পালন করতেন না। তিনি পুরো শা‘বান মাসই সিয়াম পালন করতেন’।                                          [বুখারী, হা/১৯৭০]

উম্মু সালামা [রাঃ] বলেন, ‘নবী করীম [সাঃ]-কে শা‘বান ও রামাযান ব্যতীত একাধারে দুই মাস সিয়াম পালন করতে দেখিনি’।                                                                                 [তিরমিজি হা/৬৩৬]

আয়েশা [রাঃ] বলেন, ‘শা‘বান মাসের মত আর কোন মাসে এত অধিক নফল সিয়াম রাখতে আমি রাসূল [সাঃ]-কে দেখিনি। এ মাসের কিছু ব্যতীত বরং পুরো মাসই তিনি সিয়াম রাখতেন’। [তিরমিজি হা/৬৩৭]

শা‘বান মাসের কয়েকদিন ব্যতীত সিয়াম পালন করা রাসূল [সাঃ]-এর জন্য খাছ ছিল। উম্মতের জন্য তিনি প্রথম অর্ধাংশ পসন্দ করেছেন। তিনি বলেন, ‘শা‘বান মাসের অর্ধেক অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে রামাযান না আসা পর্যন্ত আর কোন সিয়াম নেই’। তবে কেউ সিয়াম রাখতে অভ্যস্ত হ’লে সে রাখতে পারে।                                                               [ইবনু মাজাহ, হা/১৬৫১; তিরমিজি হা/৭৩৮]

৩. রমজান মাসের সিয়ামঃ

আবূ হুরায়রা [রাঃ] হতে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের সিয়াম রাখলো, তার পূর্বের গুণাহরাশি মাফ করা হলো।

[সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪১, ১৩২৬ এর অনুরূপ, সহীহ তারগীব ৯৮২, ইরওয়াহ ৯০৬]

৪. শাওয়াল মাসের সিয়াম:

শাওয়াল মাসে ৬টি সিয়াম রাখা অতি গুরুত্বপূর্ণ। আবূ আইয়ূব আনসারী [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, “যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখলো, তারপর এর পরপরই শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখলো, সে যেন পূর্ণ এক বছরের রোযা রাখলো।”

[মুসলিম ১১৬৪, তিরমিজি ৭৫৯, আবূ দাউদ ২৪৩৩, ইবনু মাজাহ ১৭১৬, আহমাদ ২৩০২২, ২৩০৪৪, দারেমী ১৭৫৪, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬২]

৫. যিলহজ্জ ও আরাফার সিয়াম:

নফল সিয়ামের মধ্যে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক ও আরাফার দিনের সিয়ামের মর্যাদা সবচেয়ে বেশী। যিলহজ্জের প্রথম দশকের সিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন,“এই দিনগুলির [অর্থাৎ, যুল হিজ্জার প্রথম দশ দিনের] তুলনায় এমন কোন দিন নেই, যাতে কোন সৎকাজ আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।” লোকেরা বলল, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয় কি?’ তিনি বললেন, “আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে কোন [মুজাহিদ] ব্যক্তি যদি তার জান মালসহ বের হয়ে যায় এবং তার কোন কিছুই নিয়ে আর ফিরে না আসে।” [অর্থাৎ, শাহাদত বরণ করে, তাহলে হয়তো তার সমান হতে পারে।]

[সহীহুল বুখারী ৯৬৯, তিরমিজি ৭৫৭, আবূ দাউদ ২৪৩৮, ইবনু মাজাহ ১৭২৭, আহমাদ ১৯৬৯, ৩১২৯, ৩২১৮, দারেমী ১৭৭৩, রিয়াদুস সলেহীন ১২৫৭]

 

আরাফার দিনের সিয়াম প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘আরাফার দিনের সিয়াম সম্পর্কে আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন’।                                                          [মুসলিম ১১৬২, রিয়াদুস সলেহীন ১২৫৮]

 

উল্লেখ্য, আরাফার দিনে আরাফায় অবস্থানকারী হাজীগণ সিয়াম পালন করবেন না। এছাড়া অন্যান্য সকল মুসলমান নফল সিয়ামের মধ্যে সর্বাধিক নেকী সম্পন্ন এই সিয়াম পালন করে অশেষ নেকী অর্জনে সচেষ্ট হবেন।

৫. প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম:

প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম রাখা রাসূল [সাঃ]-এর নিয়মিত ও পসন্দনীয় আমল। তিনদিন সিয়াম রাখার বিনিময়ে পুরো মাস সিয়াম রাখার সমান নেকী পাওয়া যায়। আবূ যার [রাঃ] হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম রাখে তা যেন সারা বছর সিয়াম রাখার সমান। এর সমর্থনে আল্লাহ তাঁর কিতাবে নাযিল করেন, ‘যদি কেউ একটি ভাল কাজ করে তার প্রতিদান হ’ল এর দশগুণ’ [আন‘আম ৬/১৬০]। সুতরাং এক দিন দশদিনের সমান।                        [তিরমিজি হা/৭৬২, ইবনু মাজাহ, হা/১৭০৮]

 

চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে এই সিয়াম রাখা সুন্নাত। যেমন- রাসূলুল্লাহ [সাঃ] আবূ যার [রাঃ]-কে বলেন, হে আবূ যার! তুমি প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম রাখতে চাইলে তের, চৌদ্দ ও পনের তারিখে রাখ’।                                                                                                                                   [তিরমিজি হা/৭৬১]

আব্দুল্লাহ ইবনে আম্‌র ইবনে আ'স [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, “প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখা, সারা বছর ধরে রোযা রাখার সমান।              [বুখারী ১১৫৯, ১৯৭৫, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬৮]

 

 

৬. সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম:

সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়ামের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আবূ হুরাইরা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেছেন, “[মানুষের] আমলসমূহ সোম ও বৃহস্পতিবারে [আল্লাহর দরবারে] পেশ করা হয়। তাই আমি ভালবাসি যে, আমার আমল এমন অবস্থায় পেশ করা হোক, যখন আমি রোযার অবস্থায় থাকি।”

[মুসলিম ২৫৬৫, তিরমিজি ৭৪৭, ২০২৩, আবূ দাউদ ৪৯২৬, ইবনু মাজাহ ১৭৪০, আহমাদ ৭৫৮৩, ৮১১৬, ৮৯৪৬, ৯৯০২, ২৭৪৯০, ২৭২৫০, মুওয়াত্তা মালিক ১৬৮৬, ১৬৮৭, দারেমী ১৭৫১, রিয়াদুস সলেহীন ১২৬৪]

৭. দাঊদ [আঃ]-এর সিয়াম:

রাসূলুল্লাহ [সাঃ] দাঊদ [আঃ]-এর সিয়ামকে সর্বোত্তম বলেছেন। তিনি বলেন, ‘দাঊদ [আঃ]-এর সিয়াম সর্বোত্তম। তা হচ্ছে অর্ধেক বছর। [সুতরাং] একদিন সিয়াম পালন কর ও একদিন ছেড়ে দাও’।                                                                                                        [বুখারী হা/১৯৮০]

নিষিদ্ধ সিয়াম:

কিছু কিছু দিনে সিয়াম পালনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হ’ল-

[১] ছওমে বিছাল [বিরতিহীন সিয়াম]: ছাওমে বিছাল হচ্ছে ইফতার ও সাহারী গ্রহণ ব্যতীত দিনের পর দিন সিয়াম পালন করা। এটি নিষিদ্ধ।                                                                        [বুখারী হা/১৯৬৫]

 

[২] সারা বছরের সিয়াম: সারা বছর সিয়াম পালন করা নিষিদ্ধ। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর [রাঃ] সারা বছর সিয়াম পালন করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ [সাঃ] দাঊদ [আঃ]-এর সিয়ামের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এর চেয়ে উত্তম সিয়াম আর নেই’।                                                                                         [বুখারী হা/১৯৭৬]

অন্যত্র এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সারা বছর সিয়াম রাখে, সে মূলতঃ সিয়ামই রাখে না’।          [নাসাঈ হা/২৩৭৩]

[৩] শনিবারের সিয়াম: রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, তোমাদের উপর ফরযকৃত সিয়াম ব্যতীত কেউ যেন শনিবারে সিয়াম না রাখে। আঙ্গুরের লতার বাকল বা গাছের ডাল ছাড়া অন্য কিছু যদি না পায় তবে সে যেন [ভঙ্গ করার জন্য] তাই চিবিয়ে নেয়।                                                              [তিরমিজি হা/৭৪৪]

ইমাম তিরমিজি [রহঃ] বলেন, ‘এই সিয়াম মাকরূহ হওয়ার কারণ হচ্ছে, কেবল শনিবারকে [নফল] সিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করা। কারণ ইহুদীরা শনিবারকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে।’                         [ঐ, পৃঃ ১৮৪]

[৪] শুক্রবারের সিয়াম: জুয়াইরিয়া [রাঃ] বলেন, তিনি সিয়ামরত অবস্থায় রাসূল [সাঃ]-এর নিকট প্রবেশ করেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি গতকাল সিয়াম পালন করেছিলে? তিনি বললেন, না। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আগামী দিন কি সিয়াম পালনের ইচ্ছা রাখ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বললেন, তাহলে সিয়াম ভেঙ্গে ফেল’।                                                                              [বুখারী, হা/১৯৮৬]

বৃহস্পতিবার অথবা শনিবার সিয়াম রাখার নিয়ত না থাকলে শুধু শুক্রবার সিয়াম রাখতে রাসূল [সাঃ] অত্র হাদীছে নিষেধ করেছেন।

[৫] দুই ঈদের দিনের সিয়াম: ওমর [রাঃ] বলেন, রাসূল [সাঃ] এই দুই দিন সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন। [ঈদুল ফিতরের দিন] যেদিন তোমরা সিয়াম ছাড়। আরেকদিন, যেদিন তোমরা কুরবানীর গোশত খাও। অর্থাৎ ঈদুল আযহার দিন।                                         [বুখারী, হা/১৯৯০, ১৯৯১, ১৯৯৩, ১৯৯৫]

[৬] আইয়ামে তাশরীক-এর সিয়াম: যিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে আইয়্যামে তাশরীক বলা হয়। ঈদুল আযহার দিনের পরের এই দিনগুলোতে আরবরা গোশত শুকাত বলে এই দিনগুলোকে আইয়্যামে তাশরীক বলা হয়। রাসূলুল্লাহ [সাঃ] বলেন, ‘আইয়ামে তাশরীক হ’ল পানাহার ও আল্লাহর যিকরের দিন’।                                                                     [মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৫২]

নফল সিয়ামের নিয়ত, নফল সিয়াম ভাঙ্গা ও তার কাযা:

‘নিয়ত’ অর্থ সংকল্প। যা মুখে উচ্চারণ করতে হয় না। মনে মনে সংকল্প করাই যথেষ্ট। নফল সিয়ামের নিয়ত সাহারীর পূর্বে করা শর্ত নয়। পরেও নিয়ত করা যায়। কোন ওযর ব্যতীত নফল সিয়াম ভাঙ্গা যায়। পরে তার কোন কাযা করারও আবশ্যকতা নেই।                                       [মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৭৬]

পরিশেষে নফল ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তাই বেশী বেশী নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা আমাদের জন্য জরূরী। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে নফল ইবাদত করার তাওফীক দান করুন- আমীন!!

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন