একটা ঘটনা বলি, পড়ুন। যা আপনাকে নতুন করে চিন্তা করতে সাহায্য করবে। আপনাকে অনুপ্রেরণা দিবে। আপনার ঈমানের একটা আয়না হবে। আপনার অন্তরে একটা ধাক্কা দিবে।
এই ঘটনা যার, তার নাম সুহাইব রূমী (রা.)। একজন সাহাবী। যার ঈমান দেখে স্বয়ং আল্লাহ কুরানের আয়াত নাজিল করেছে। নবী (স.) তার উপর খুশি হয়ে বলেছিলেন, 'হে সুহাইব! দারুণ লাভের ব্যবসায় করেছ! খুব লাভবান হয়েছ এই কেনাবেচায়।’
ঘটনা মন দিয়ে পড়ুন।
.
সুহাইব রূমী ছোটবেলায় রোমসাম্রাজ্যের অট্টালিকা ও প্রসাদসমূহে প্রতিপালিত হয়েছেন। যদিও তার শিকড় ছিল আরবে। তবে রোমদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মাঝেই তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো ভুলেননি যে তিনি দুরন্ত আরবের এক মরুর সন্তান।
তার আরব দেশে ফিরার তীব্র ইচ্ছা ছিল। এবং সময়ের সাথে সাথে সেই ইচ্ছা আরো তীব্রতর হয়ে উঠল। একদিন সুহাইব এক খ্রিষ্টান আলেমের কাছ থেকে শুনতে পারলেন যে, ' সেই সময়টি একেবারেই নিকটবর্তী হয়ে গেছে, যখন আরব দেশের পবিত্র মক্কা নগরীতে আবির্ভূত হবেন এমন একজন নবী যিনি সত্য প্রমাণ করবেন হযরত ইসা আলাইহিস সালামের নবুওয়াত-রেসালাতকে এবং যিনি মানুষের কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে পৌছে দেবেন ঈমান ও হেদায়াতের আলোকিত রাজপথে।'
এই কথা শুনে সুহাইব রূমী রোম থেকে ছুটতে লাগলেন আরবদের আশ্রয়কেন্দ্র, প্রতীক্ষিত নবীর জন্মভূমি মক্কার উদ্দেশ্যে।
সুহাইব রূমী মক্কার বিখ্যাত সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের আশ্রয়ে জীবন-যাপন শুরু করলেন। এই সময়ের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন। তবে এই ব্যবসায় এবং প্রচুর অর্থ সম্পদ তাকে সেই খ্রিষ্টান আলেমের কথা ভুলাতে পারে নি। সে অধীর অপেক্ষায় থাকে সেই ভবিষ্যতবাণী নিয়ে যে কখন আসবে সেই নবী। কখন ঘটবে সেই নবীর আগমন!
অল্প কিছুদিন পরেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই প্রশ্নের জবাব তার সামনে এসে গেল।
কোনো একদিনের কথা। সুহাইব রূমী দীর্ঘ ও দূরবর্তী এক বাণিজ্যিক সফর শেষ করে মক্কায় ফিরে এসেছেন। এসে বিভিন্ন মানুষের মুখে শুনতে পেলেন, আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদকে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই ভিত্তিতে তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান গ্রহণের আহবান জানাচ্ছেন। ন্যায় ও সতকর্মের প্রতি মানু্ষকে উদ্বুদ্ধ করছেন। অন্যায় এবং অশ্লীল কাজ থেকে তাদের বাধা প্রদান করছেন।
সুহাইব ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলেন, 'লোকেরা যাকে আল-আমীন বলে ডাকে তিনিই কি এই ব্যক্তি নন?'
তারা বললেন, 'হ্যা, হ্যা। সেই নবী আর আল-আমীন একই ব্যক্তি।'
সুহাইব আবার প্রশ্ন করলেন, 'তার বাড়িটা কোথায়?'
জবাবে তাকে জানানো হলো, 'আরকাম ইবনে আবিল আরকাম-এ তার বাড়ি। সাফা পর্বতের পাদদেশে।
তবে সাবধান হে যুবক। কুরাইশরা কেউ যেন তোমাকে সেখানে দেখতে না পায়। তাদের কেউ যদি তোমাকে সেখানে দেখে ফেলে তাহলে ওরা তোমার সর্বনাশ করে ফেলবে। নানানভাবে ওরা তোমার উপর নির্যাতন করতে থাকবে। এখানে সাহায্য করার মতো কোনো নিকট আত্মীয় তোমার নেই। ওদের হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করার মতো নিজ বংশের কেউই নেই। সুতরাং সাবধান।'
অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চারপাশ খেয়াল রেখে সুহাইব একদিন 'দারুল-আরকামে' হাজির হলেন। সেখানে পৌছার পর দরজায় দেখতে পেলেন আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে। পূর্বপরিচিত হলেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন সে। তবে এক মুহুর্তের মধ্যেই ইতস্তত ভাব ঝেড়ে ফেলে কাছে গিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন, '
'আম্মার তুমি এখানে? কী চাও?'
একই রকম বিষ্ময় ও জিজ্ঞাসা চোখেমুখে ফুটিয়ে আম্মার পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, 'আমি কেন এখানে। কী চাই সে কথা একটু পর বলছি। তুমিই আগে এই প্রশ্নের জবাব দাও যে তুমি এখানে কেন? এবং কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
সুহাইব বললেন, 'এখানে আল-আমিনের বক্তব্য শোনার উদ্দ্যেশ্যে তার কাছে দেখা করতে এসেছি'।
আম্মার বললেন, 'আমিও একই কাজের জন্য এখানে এসেছি।'
সুহাইব বললেন, ' তাহলে চলো। একসঙ্গেই দুজনে ভিতরে ঢুকে তার সাথে দেখা করি।'
আম্মার এবং সুহাইব একসাথে নবী(সা:) এর সাথে সাক্ষাত করতে দারুল আরাকামে প্রবেশ করলেন। দুজনেই গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলেন নবীজির সমস্ত কথা। দু'জনেই একসাথে হাত বাড়িয়ে দিলেন নবীজি কাছে। দৃপ্ত শপথের মতো একসুরে ঘোষণা করলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'
তারা উভয়েই সেদিনের পুরো সময় নবীজির সঙ্গে কাটালেন। তার উপদেশ ও নির্দেশনায়, তার আচরণ ও স্বভাবমাধুর্যে নিজেদের যথাযম্ভব সবাসিত করে তুললেন।
যখন রাত ঘনিয়ে এলো। কোলহল থেমে সবদিক নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। তখন তারা দু'জন নবীজির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। অল্পসময়ের এই সাক্ষাতের বদৌলতে তারা বুকের মধ্যে বয়ে আনলেন এত নূর যা দিয়ে আঁধার পৃথিবীর সবটুকু আলোকিত করা সম্ভব।
ঈমান আনার কারণে সুহাইব (রা:) এর উপর কুরাইশের লোকদের অমানবিক ও নির্মম অত্যাচার শুরু হয়।
এসব কিছু তিনি সহ্য করেছে মুখ বুজে-নীরবে, প্রশান্ত ও স্থিরচিত্তে। কারণ তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে জান্নাতের পথে নির্যাতন আর শাস্তি অবধারিত। এপথ কষ্টে-ঘেরা, কাঁটায়-ভরা।
।
নবী (সা:) যখন সাহাবীদের মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দিলেন। তখন সকল সাহাবী একে একে ও দলবঁধে মদিনায় হিজরত করলেও সুহাইব (রা:) নবী (সা:) এবং আবু বকর(রা:) এর সাথে হিজরত করার সিদ্ধান্ত স্থির করেন। কিন্তু কুরাইশের লোকেরা তার সিদ্ধান্তের কথা অনুমান করতে পেরে তার হিজরতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা সুহাইব (রা:)র চারপাশে সর্বক্ষণিক নজরদারি করার জন্য পাহারা বসিয়ে দিল, যেন তিনি তার সব সোনা- রূপ্য ও সম্পদ নিয়ে হিজরত করতে না পারে।
নবী (সা.) এবং তার সঙ্গী আবু বকর (রা.) মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার পর থেকে সুহাইব(রা.) হিজরতের এই মহান যাত্রায় তাদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু তিনি সেরকম কোনো সুযোগই বের করতে পারলেন না। কারণ, তার চারপাশে নিয়োজিত সার্বক্ষণিক প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টির কঠিন বেষ্টনী ভেদ করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং কোনো কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া তিনি উপায় দেখতে পেলেন না।
ভীষণ কণকণে এক শীতের রাতে সুহাইব (রা.) ডাইরিয়ার আক্রান্ত ব্যক্তির মতো বদনা নিয়ে বারবার বাইরে যেতে লাগলেন। দীর্ঘসময় পার করে ফেরার একটু পরেই আবার বদনা হাতে দৌড়। অবস্থা দেখে প্রহরীরা তাকে বাস্তব আমাশয়ে আক্রান্তরোগী ভেবে খুব মজা পেল এবং একে অন্যকে বলতে লাগল, ' দেখো দেখো লাত-উযযার ক্রোধে আমাশায় তাকে কিভাবে পাকড়াও করেছে! বেচারা! সারারাত বদনা নিয়ে দৌড়াক। আমরা আজকের রাতটা একটু আরাম করে ঘুমাই।'
ব্যস! নিশ্চিন্ত মনে তারা বিছানায় চলে গেল এবং অল্পসময়ের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সুহাইব (র.) বেশিদূর যেতে পারলেন না হঠাৎ প্রহরীরা বুঝতে পারল যে তিনি এখান থেকে সটকে পড়েছেন। আতঙ্কিত হয়ে তারা বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। অল্পক্ষণেই তারা সুহাইবকে পেয়ে গেল এবং তাকে ঘেড়াও করে ফেলল।
বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরে সুহাইব পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলেন। তূণীর থেকে সবগুলো তীর বের করলেন। ধনুকে লাগিয়ে তাক করে ধরে চিৎকার করে বললেন, ' হে কুরাইশের লোকেরা। তীর চালানায় আমার দক্ষতার কথা তোমরা ভালো করেই জানো৷ তারপরও আমি তোমাদের আরেকবার জানিয়ে দিচ্ছি, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মধ্যে সব চেয়ে দক্ষ ও শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। আল্লাহর শপথ। আমার হাতে যতক্ষণ শক্তি আছে তোমাদের কাউকেই আমার কাছে আসতে দিব না। একেকটা তীর দিয়ে তোমাদের একেকজনকে হ-ত্যা করব। এরপর যে কয়জন বেঁচে থাকবে, তরবারি দিয়ে তাদের সবগুলোকে খতম করব'।
সুহাইব এর এই দৃপ্ত মরণপণ শপথ ও চ্যালেঞ্জ শুনে একজন বলে উঠল, ' হে সুহাইব। মক্কায় আসার সময় তুমি ছিলে একেবারে নিঃস্ব- ফকির। এই মক্কাতেই তুমি ব্যবসা বানিজ্য করে হয়ছো অঢেল সম্পদের মালিক। আল্লাহর কসম! আমরা ওইসব সম্পদ নিয়ে তোমাকে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে অক্ষত অবস্থায় চলে যেতে দেব না।'
সুহাইব (রা.) বুঝতে পারলেন অর্থই তাদের প্রধান দুর্বলতা। সাথে সাথে বললেন', যদি আমার সকল সম্পদ তোমাদের দিয়ে দেই। তাহলে কী আমাকে যেতে দিবে?'
তারা বলল, 'হ্যা। তাহলে তুমি নিশ্চিন্তে যেতে পারবে।'
সুহাইব (র.) তার বাড়ির সেই স্থানটির কথা তাদের বলে দিলেন যেখানে সোনা-দানা ও সারাজীবনের সম্পদ সঞ্চিত করে রাখা আছে। তারা কয়েকজন মক্কায় গিয়ে নির্দিষ্ট স্থান থেকে সকল সম্পদ বের করে নিল। এরপর তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, 'এবার তুমি চলে যেতে পারো।'
সুহাইব (রা.) আর এক মুহুর্ত দেরি না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্য বানিয়ে অবিরাম ছুটে চললেন মদীনার দিকে। যে অঢেল সম্পদ অর্জনের জন্য ব্যয় হয়েছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়- সেই সম্পদটুকু মক্কায় ফেলে আসার জন্য তার মধ্যে কোনো আফসোস ছিল না।
মদিনার অদূরে মদিনার প্রবেশপথ 'কুবায়' পৌছালে নবী(সা.) তাকে এভাবে আসতে দেখে খুব খুশি হলেন। এবং তাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, 'হে সুহাইব! দারুণ লাভের ব্যবসায় করেছ! খুব লাভবান হয়েছ এই কেনাবেচায়।’
এই কথা শুনে সুহাইব এর চেহারা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তিনি বললেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ। আজ আমার আগে তো কেউ মক্কা থেকে আপনার কাছে আসেনি। নিশ্চয়ই এই সংবাদ জিব্রাইল (আ:) ছাড়া অন্য কেউ আপনাকে বলেনি।
সত্যিই তার বানিজ্য লাভজনক হয়েছে। আসমান থেকে ওহী এসে যার সত্যতা প্রকাশ করেছে। মহান আল্লাহ তাকে উদ্দেশ্যে করে নবী(সা.) এর কাছে আয়াত নাজিল করে বলেছিলেন, 'এমন মানুষও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির লাভের জন্য নিজেকে বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত সদয়।' ২:২০৭
এই থেকে যেন আমরা শিক্ষা নেই৷ এর জন্য এই আয়াত কেয়ামত পর্যন্ত আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দিতে বলেন। কেয়ামত পর্যন্ত এমন এমন মানুষ থাকবে যারা নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য বিলিয়ে দিবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই দুনিয়া ছুড়ে ফেলবে।
আল্লাহ আমাদের কবুল করুক তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য...।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন