এটি নবুয়তের সপ্তম বছরের ঘটনা। মক্কার কুরাইশরা যখন দেখল যে ইসলামের দাওয়াত ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে এবং এমনকি উমর (রা.) ও হামযাহ (রা.)-এর মতো শক্তিশালী ব্যক্তিরাও ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তখন তারা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার চক্রান্ত করতে লাগল।
এই সংকটময় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিব তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে রক্ষার জন্য বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রকে একত্রিত করলেন। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে (একমাত্র আবু লাহাব বাদে) সবাই গোত্রীয় সংহতির খাতিরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষা করতে সম্মত হলো। তারা সবাই মক্কার উপকণ্ঠে **'শিয়াবে আবু তালিব'** নামক একটি পাহাড়ী উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় কুরাইশরা এক অমানবিক সিদ্ধান্ত নিল। তারা একটি চুক্তিপত্র লিখল যে:
> "যতক্ষণ না বনু হাশিম গোত্র মুহাম্মাদ (সা.)-কে হত্যার জন্য আমাদের হাতে তুলে দেবে, ততক্ষণ আমরা তাদের সাথে কোনো কেনাবেচা করব না, তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রাখব না এবং তাদের কাছে কোনো খাদ্যশস্য পৌঁছাতে দেব না।"
এই নিষ্ঠুর চুক্তিপত্রটি কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। শুরু হলো এক ভয়াবহ অবরোধ। দীর্ঘ তিনটি বছর রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাথীরা এই উপত্যকায় অবরুদ্ধ অবস্থায় কাটালেন। অবরোধের ফলে সেখানে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিল। অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে, ক্ষুধার জ্বালায় সাহাবীরা গাছের পাতা এবং শুকনো চামড়া সেদ্ধ করে খেতে বাধ্য হতেন। শিশুদের ক্ষুধার্ত কান্নায় মক্কার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠত, কিন্তু পাষাণ কুরাইশদের মন তাতেও গলত না।
এই চরম কষ্টের সময়েও রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অটল। তিনি সাহাবীদের ধৈর্য ধরার নসিহত করতেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতেন। আম্মাজান খাদিজা (রা.) তাঁর জীবনের সমস্ত সম্পদ এই অবরুদ্ধ দিনগুলোতে ব্যয় করে দিয়েছিলেন।
অবশেষে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু তালিবকে জানালেন যে, আল্লাহ ওই নিষ্ঠুর চুক্তিপত্রটির ওপর 'উঁইপোকা' লেলিয়ে দিয়েছেন এবং আল্লাহর নাম লেখা অংশটি বাদে বাকি সব অংশ পোকা খেয়ে ফেলেছে। আবু তালিব কুরাইশদের কাছে গিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন যে, "আমার ভ্রাতুষ্পুত্র যা বলছে তা যদি সত্য হয়, তবে তোমাদের এই অন্যায় অবরোধ তুলে নিতে হবে।"
কুরাইশরা পরীক্ষা করে দেখল ঠিক তাই ঘটেছে। ইতিমধ্যে হিশাম ইবনে আমর এবং যুহাইর ইবনে আবী উমাইয়ার মতো কিছু দয়ালু কুরাইশ নেতাও এই অবরোধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর পর এই অমানবিক অবরোধের অবসান ঘটে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) বিজয়ীর বেশে উপত্যকা থেকে বেরিয়ে আসেন। এই ঘটনাটি ছিল মুমিনদের ঈমানের এক কঠিন পরীক্ষা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান সাহায্য।
উৎস: আর-রাহীকুল মাখতূম (মহিমান্বিত ফোয়ারা) — শাইখ সফিউর রহমান মোবারকপুরী*

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন