প্রায় ৪০০ বছর জমজম কূপটি কোথায় কেউ জানতোই না! দীর্ঘকাল মক্কা শাসন করে জুরহুম গোত্র। তারা ছিলো ইয়েমেন থেকে আসা। এই গোত্রের মেয়েকে ইসমাইল আলাইহিস সালাম বিয়ে করেন। প্রথমে একজনকে, পরবর্তীতে তাকে তালাক দিয়ে বিয়ে করেন রাঈলা বিনতে মুদাদ নামে জুরহুম গোত্রের নেতার মেয়েকে। এই গোত্র প্রায় ১৮০০/২০০০ বছর মক্কা শাসন করে। একপর্যায়ে তারা যালিম হয়ে ওঠে৷
যখন বুঝতে পারলো তাদের পতন আসন্ন, তখন তারা জমজম কূপে তাদের সম্পদ ফেলে ভর্তি করে। এই কাজটি করে আমর বিন আল হারিস। মক্কার নতুন শাসক বনু খুজাআ গোত্র। ক্ষমতায় আসার পর তাদেরও কোনো ম্যান্ডেট ছিলো না জমজম কূপ খুঁজে বের করা। যার ফলে জুরহুম থেকে বনু খুজাআ, কয়েক শতক পর্যন্ত জমজম কূপের পানি পানের সুযোগ থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়।
বনু খুজাআও একসময় যালিম হয়ে ওঠে। কাবার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেনি। তখন তাদেরই গোত্রপ্রধানের জামাতা কুসাই ইবনে কিলাব তার শ্বশুরবাড়ির গোত্রকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে মক্কায় নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সে এক লম্বা ইতিহাস!
কুসাই ইবনে কিলাব কুরাইশ গোত্রকে একত্রিত করেন, সবাইকে মক্কায়, কাবার আশেপাশে নিয়ে আসেন। এরপর কেটে যায় প্রায় ১০০ বছর। জমজম কূপের কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। বনু জুরহুম মক্কা ত্যাগের প্রায় ৪০০ বছর ধরে আর জমজম কূপের কথা কেউ মনে রাখেনি। একদিন আব্দুল মুত্তালিব কা'বার প্রাঙ্গণে ঘুমাচ্ছিলেন।
স্বপ্নে তাকে বলা হলো— তাইয়্যিবা (পবিত্র)।
তিনি স্বপ্নের মানে বুঝতে পারলেন না।
পরের রাতে স্বপ্নে তাকে বলা হলো— বাররা (কল্যাণময়ী)।
তিনি এই সাংকেতিক ভাষাও বুঝতে পারলেন না।
পরের রাতে বলা হলো— মাজনূনা (গোপন ভাণ্ডার)।
এরপরও বুঝলেন না। উল্লেখ্য, বনু জুরহুম মক্কা ত্যাগের আগে তাদের সমস্ত সম্পদ জমজমে কূপে ফেলে যায়। স্বর্ণ, হাতিয়ার ছিলো। চতুর্থ রাতে আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখলেন তাকে বলা হচ্ছে- জমজম। এটা কোথায় আছে জিজ্ঞেস করলে স্বপ্নেই তাকে বলা হয়— যেখানে রক্ত, গোবর, পিঁপড়ার বাসা এবং কাকের ঠোকর দেখা যায়। এবার আব্দুল মুত্তালিব বুঝতে পারলেন পবিত্র, কল্যাণময়ী, গোপন রত্নভান্ডার সেই কূপ খুঁড়তে হবে। আব্দুল মুত্তালিব তার একমাত্র ছেলে হারিসকে নিয়ে জমজম কূপটি খনন করতে লাগলেন।
কুরাইশরা এসে বাধা দিলো। কারণ, কাবা ঘরের পাশে এভাবে খনন করাটা কুরাইশদের কাছে 'ধর্মীয় অবমাননা' ছিলো। আব্দুল মুত্তালিব বুঝাতে সক্ষম হলে তিনি ছেলেকে নিয়ে খনন কাজ শুরু করেন। চিন্তা করেন এর কয়েক হাজার বছর আগের ঘটনা। কাবা নির্মাণের সময় এরকমই বাবা ছেলে কাজ করেন; ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এবং ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। আব্দুল মুত্তালিব জমজম কূপ খনন করে দেখেন অনেক রত্নভান্ডার। চিন্তা করুন, কূপ খনন করে আপনি প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ পেলেন, তখন কী হবে?
এখন মক্কার সবাই দাবি করলো এই সম্পদের ভাগ। কিন্তু, আব্দুল মুত্তালিব বললেন, এটা আমাদেরই। আল্লাহ আমাকেই স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সম্পদের মালিকানা, জমজমের মালিকানা নিয়ে ঝগড়া লাগলে সমাধানের জন্য তারা যেতে চাইলো একজন গণকের কাছে। তখনকার যুগে মক্কাবাসী কোনো সমস্যায় পড়লে সেই সমস্যার সমাধান তাদের 'পার্লামেন্ট' দারুন নাদওয়ায় না হলে তারা গণকের কাছেই যেতো।
সবাই গণকের কাছে গেলে যাত্রাপথে পানি সংকটে পড়ে। আব্দুল মুত্তালিবের উটের পায়ের নিচ থেকে তখন পানি বয়ে গেলে তারা এই অলৌকিক নিদর্শন দেখে মেনে নেয় যে, আব্দুল মুত্তালিবই হবেন জমজমের রক্ষণাবেক্ষক। সেই সময় আব্দুল মুত্তালিবের ছিলো মাত্র ১ জন ছেলে— হারিস। তিনি জানতেন, গোত্রভিত্তিক সমাজে ক্ষমতা তারই বেশি, যার দল বড়, যার সন্তান বেশি। তা না হলে কেনোই বা তার খনন করা কূপে অন্যরা দাবি করবে? সেই সফরে তিনি মানত করেন, আল্লাহ যদি আমাকে ১০ জন পুত্রসন্তান দান করেন, তাহলে আমি একজনকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি দেবো!
এটা ছিলো আবেগের বশে নেয়া একটা মানত। কিন্তু, আব্দুল মুত্তালিব তার সংকল্প পূরণে এতোটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, এরপর তিনি আরো ৪টি বিয়ে করেন; মোট ৫টি। একসময় তার সেই স্বপ্নপূরণ হয়। ৫ জন স্ত্রীর গর্ভে তার মোট ১৬ জন সন্তান— ১০ জন ছেলে, ৬ জন মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
কুরাইশদের নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব রওনা দিয়েছিলেন খাইবারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু, যাত্রাপথের অলৌকিক ঘটনায় সবাই আব্দুল মুত্তালিবের জমজমের তত্ত্বাবধায়ক মেনে নিলে সবাই চলে আসেন মক্কায়। আব্দুল মুত্তালিব হাজীদের পান করানোর এবং খাবার খাওয়ানোর (সিকায়াহ, রিফাদাহ) দায়িত্ব পেয়েছিলেন পারিবারিক সূত্রে আগেই। এবার জমজম কূপের তত্ত্বাবধায়ক হবার কারণে মক্কায় তার মর্যাদা অনেকগুণ বেড়ে যায়। জমজম পুনরাবিষ্কারের ঘটনাটি ঘটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের প্রায় ১০০ বছর আগে। প্রায় ৪০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপ পুনরাবিষ্কার করে আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের হিরো হয়ে যান।
সেই সময় মরু এলাকায় একটা কূপ খুঁজে পাওয়া এখনকার তেলের খনি খুঁজে পাওয়ার চেয়ে কোনাংশেই কম ছিলো না!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন