ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর এই চমৎকার গল্পটি আস্তাগফিরুল্লাহ বলার অপরিসীম ফজিলত ও ক্ষমতা নিয়ে এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেয়। এটি এমন একটি ঘটনা, যা শুনলে মন ভরে যায়, চোখে পানি চলে আসে এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। চলুন, বিস্তারিতভাবে শুনি এই গল্প।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও আলেম। তিনি ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর ওস্তাদ ছিলেন। তাঁর মুখস্থ ছিল প্রায় দশ লক্ষ হাদিস! তিনি যে বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন, তার নাম ‘মুসনাদে আহমদ’—যেখানে তিনি প্রায় চল্লিশ হাজার হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি হাদিস সংগ্রহের জন্য দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতেন।
একদিনের ঘটনা। ইমাম আহমদ (রহঃ) কোনো এক শহরে সফরে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যা হয়ে গেল। নামাজ শেষে তিনি একটি মসজিদে গিয়ে বললেন, “ভাইয়েরা, আমি একজন মুসাফির। রাতটা এখানে থাকার একটু জায়গা দিতে পারবেন?”
কিন্তু মসজিদের লোকেরা তাঁকে চিনতে পারল না। তাঁর নাম-পরিচয় জানা ছিল না। তাই তারা সরাসরি বলে দিল, “না, এখানে মুসাফিরদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্য কোথাও দেখুন।”
বৃদ্ধ ইমাম আহমদ (রহঃ) হতভম্ব হয়ে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাত গভীর হচ্ছে, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। রাস্তায় শুয়ে থাকবেন—এমন অবস্থা।
ঠিক তখনই পাশের একটি রুটির দোকানের যুবক মালিক তাঁকে দেখে দয়া করে বলল, “ভাই, যদি ইচ্ছা হয়, আমার বাড়িতে চলুন। রাতটা আমার ঘরে কাটিয়ে যান।”
ইমাম আহমদ (রহঃ) খুশি হয়ে সেই যুবক রুটিওয়ালার সঙ্গে তার বাড়িতে চলে গেলেন। বাড়িতে গিয়ে দেখলেন—যুবকটি সকালের জন্য রুটি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত জেগে ময়দা মাখছে, আগুন জ্বালাচ্ছে, রুটি সেঁকছে—প্রতিটি কাজের সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে একটাই কথা: “আস্তাগফিরুল্লাহ… আস্তাগফিরুল্লাহ… আস্তাগফিরুল্লাহ…”
ময়দা মাখতে মাখতে আস্তাগফিরুল্লাহ, রুটি গড়তে গড়তে আস্তাগফিরুল্লাহ, আগুনে দিতে দিতে আস্তাগফিরুল্লাহ, উল্টাতে উল্টাতে আস্তাগফিরুল্লাহ। প্রতিটি কাজের সঙ্গে অবিরাম ইস্তেগফার!
ইমাম আহমদ (রহঃ) অবাক হয়ে দেখছিলেন। সকাল হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাই, তুমি এত বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ বলছ কেন? এর মধ্যে এমন কী ফজিলত আছে?”
যুবকটি হেসে উত্তর দিল, “হুজুর, আমাদের প্রতিটি কাজে আল্লাহর হুকুম-আহকাম রয়েছে। কিন্তু আমি জানি না—কোন কাজে, কখন, অজান্তে আল্লাহর কোনো হুকুম অমান্য হয়ে যাচ্ছে কি না। তাই প্রতিটি কাজের সঙ্গে সঙ্গে আস্তাগফিরুল্লাহ বলি, যাতে কোনো ভুল হলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।”
ইমাম (রহঃ) আরও জিজ্ঞাসা করলেন, “এই অভ্যাসের ফলে তোমার কোনো লাভ হয়েছে?”
যুবক উত্তর দিল, “আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমার সব দোয়া কবুল করেছেন। শুধু একটি দোয়া বাদে।”
ইমাম আহমদ (রহঃ) কৌতূহলী হয়ে বললেন, “কোন দোয়াটি?”
যুবকটি চোখ নামিয়ে বলল, “আমি বছরের পর বছর ধরে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি—যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর সঙ্গে যেন একবার দেখা হয়। কিন্তু সেই দোয়াটি এখনও কবুল হয়নি।”
এ কথা শুনে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) চোখ বড় বড় করে বললেন, “সুবহানাল্লাহ! ভাই, আমিই সেই ইমাম আহমদ বিন হাম্বল। আল্লাহ তোমার সেই শেষ দোয়াটিও কবুল করেছেন। তিনি আমাকে তোমার দরজায় এনে দাঁড় করিয়েছেন!”
কথাটা শুনে যুবক রুটিওয়ালা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল। সে ইমাম (রহঃ)-কে জড়িয়ে ধরল, তাঁর হাত ধরে মোসাফাহা করল, কপালে চুমু দিল এবং কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আল্লাহু আকবার! আস্তাগফিরুল্লাহ… আস্তাগফিরুল্লাহ…”
এই ঘটনা থেকে আমরা শিখি—আস্তাগফিরুল্লাহ বলা শুধু পাপ মোচনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি অসাধারণ ইবাদত। যে ব্যক্তি অবিরাম ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তাকে ‘মুজতাজাবুদ দাওয়াহ’ (যার দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল হয়) বানিয়ে দেন। তার দোয়া দেরি না করে কবুল হয়। আল্লাহ তার জীবনের সব অভাব পূরণ করে দেন—এমনকি যা সে কল্পনাও করেনি।
হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি অধিক ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ করে দেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন।” (আবু দাউদ)
তাই আজ থেকে আমরাও অভ্যাস করে নিই—প্রতিটি কাজে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে বলি: আস্তাগফিরুল্লাহ রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওয়া ওয়া আতূবু ইলাইহি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে অবিরাম ইস্তেগফারকারী বানিয়ে দিন এবং আমাদের দোয়াগুলো কবুল করুন। আমিন।
আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন