মদিনার উপকণ্ঠে রাত নেমেছে। এক কাফেলা এসে তাঁবু গেড়েছে মরুপ্রান্তরে। পথিকরা যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন তাদের পাহারায় নিয়োজিত স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং বিশিষ্ট সাহাবী আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)। খলিফা সারারাত ইবাদত করছেন আর ফাঁকে ফাঁকে কাফেলা পাহারা দিচ্ছেন। হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এলো। উমর (রা.) শব্দের উৎস অনুসরণ করে এক নারীর কাছে গিয়ে পরম মমতায় বললেন, "হে আল্লাহর বান্দী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার সন্তানের সঠিক যত্ন নিন।" এই বলে তিনি নিজের জায়গায় ফিরে এলেন। কিন্তু রাত বাড়ে, শিশুর কান্না আর থামে না। খলিফা আবারও গিয়ে সেই মাকে সতর্ক করলেন। রাতের শেষ প্রহরে যখন আবারও বাচ্চার কান্না শোনা গেল, উমর (রা.) এবার কিছুটা কড়া স্বরেই বললেন, "তুমি কেমন মা হে! সারা রাত বাচ্চাটা কাঁদছে, তুমি কি তাকে শান্ত করতে পারছ না?" সেই নারী জানতেন না যে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ পোশাকের ব্যক্তিটিই খলিফা উমর। তিনি বারবার বিরক্ত হয়ে ক্ষোভের সাথে খলিফার মুখের ওপরই বলে বসলেন, "ওহে আল্লাহর বান্দা! আপনি তো রাত থেকে আমাকে খুব জ্বালাচ্ছেন! আমি তো বাচ্চাটার দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করছি, তাই সে কাঁদছে। আপনি কেন বারবার এসে বিরক্ত করছেন?"
উমর (রা.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "জোর করার কী আছে? এত ছোট বাচ্চার দুধ কেন জোর করে ছাড়াতে চাইছ?" মহিলা তখন উত্তর দিলেন, "কারণ খলিফা উমর নিয়ম করেছেন যে, শিশু দুধ না ছাড়লে বাইতুল মাল থেকে তার জন্য কোনো ভাতা বা অর্থ বরাদ্দ করা হয় না। আমাদের অভাবের সংসার, তাই বাধ্য হয়ে তাড়াতাড়ি ওর দুধ ছাড়াতে হচ্ছে যাতে ভাতার টাকাটা পাওয়া যায়।" এই কথাটি শোনামাত্রই উমর (রা.)-এর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি শিউরে উঠলেন এই ভেবে যে, তার করা একটি নিয়ম অজান্তেই মা ও শিশুর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে আকুল হয়ে বললেন, "হে নারী, সর্বনাশ! আপনি বাচ্চাটিকে আর কষ্ট দেবেন না, ওকে মন ভরে দুধ পান করান।"
ভোর হলো। ফজর নামাজে ইমামতি করতে দাঁড়ালেন খলিফা।
কিন্তু কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল, বুক ফেটে আর্তনাদ বের হচ্ছিল। পেছনের মুসল্লিরা তার তিলাওয়াত পর্যন্ত ঠিকমতো বুঝতে পারছিলেন না। নামাজ শেষ করেই তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, "হায় উমর! তোর ধ্বংস হোক! তোর ভাতার নিয়মের লোভে পড়ে না জানি কত মুসলিম শিশু আজ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে!" সেই মুহূর্তেই তিনি এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করলেন। মদিনার অলিতে-গলিতে ঘোষক ঘোষণা করে দিলেন, "আজ থেকে কোনো মাকে ভাতার লোভে আগেভাগে বাচ্চার দুধ ছাড়াতে হবে না। এখন থেকে প্রতিটি মুসলিম শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার নির্দিষ্ট ভাতা পাবে।"
বিশ্বের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম 'শিশু সুরক্ষা ও সর্বজনীন শিশু ভাতা' ব্যবস্থার প্রবর্তন। একজন শাসকের জবাবদিহিতা এবং সাধারণ প্রজার বাক-স্বাধীনতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হতে পারে না।
— সংগৃহীত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন